Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০১:২৭, ১৭ মে ২০২৬

আপডেট: ০১:২৯, ১৭ মে ২০২৬

নিষিদ্ধ বয়ান

ফ্যাসিবাদের বিচার, নাকি আবেগের আদালত?

মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্র পুনর্গঠনের পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় সরকার, আদালতসহ—সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। আবেগের আদালত সাময়িক সহানুভূতি তৈরি করতে পারে, কিন্তু ইতিহাস রায় দেয় তথ্য ও সত্যের ভিত্তিতেই।

ফ্যাসিবাদের বিচার, নাকি আবেগের আদালত?
ছবি: সবার দেশ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন এক সময় চলছে, যখন রাষ্ট্র একদিকে অতীতের ফ্যাসিবাদী অধ্যায়ের বিচার করতে চায়, অন্যদিকে সে বিচারকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার বহুমাত্রিক প্রয়াসও দৃশ্যমান। মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক নিপীড়ন, গায়েবি মামলা, সংবাদমাধ্যম দমন এবং বিচার বিভাগকে দলীয়করণের মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত একটি শাসনব্যবস্থার পতনের পর জনগণের প্রত্যাশা ছিলো—ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হতেই আবেগ, অসুস্থতা, মানবিকতা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগকে সামনে এনে এক ধরনের নতুন বয়ান তৈরির চেষ্টা চলছে।

একসময় যারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে বিরোধী মতকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিলো, তারাই এখন মানবাধিকারের ভাষা ব্যবহার করছে। এটি নিছক কাকতালীয় নয়; বরং রাজনৈতিক বাস্তবতার নির্মম রূপান্তর। ক্ষমতায় থাকাকালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার, সাংবাদিক নির্যাতন, বিরোধী নেতাকর্মীদের রাতের অন্ধকারে গ্রেফতার, আদালতকে নিয়ন্ত্রণ এবং বিচারকদের মাধ্যমে রাজনৈতিক রায় আদায়ের যে সংস্কৃতি গড়ে তোলা হয়েছিলো, আজ সে অধ্যায়ের অভিযুক্তরাই আদালতের কাছে ‘মানবিকতা’ চাইছেন।

এখানে প্রশ্ন হচ্ছে—মানবিকতা কি শুধুই ক্ষমতাচ্যুতদের জন্য? যারা বছরের পর বছর কারাগারে থেকেও ন্যূনতম ন্যায়বিচার পাননি, যারা গুম হয়েছেন, যাদের পরিবার ধ্বংস হয়েছে, তাদের মানবাধিকারের প্রশ্ন তখন কোথায় ছিলো? রাষ্ট্র যখন একদলীয় আধিপত্যে পরিণত হয়েছিলো, তখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে যারা নীরব ছিলেন, তারাই আজ বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্তদের আদালতে হাজিরা, অসুস্থ স্বামী-স্ত্রীর সাক্ষাৎ, হুইলচেয়ারে উপস্থিতি বা শারীরিক দুর্বলতার দৃশ্য নিঃসন্দেহে মানবিক অনুভূতি তৈরি করে। কিন্তু সে আবেগকে যদি বিচার প্রভাবিত করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তবে সেটি বিচারপ্রক্রিয়ার জন্যও বিপজ্জনক। আদালত করুণা দেখাতে পারে, কিন্তু করুণার ভিত্তিতে অপরাধের দায় মুছে যায় না। বিশেষ করে যখন অভিযোগগুলো রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, গণঅধিকার হরণ এবং মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মিডিয়ার ভূমিকা। একটি বিশেষ অংশের গণমাধ্যম এখন এমনভাবে কিছু অভিযুক্তকে উপস্থাপন করছে, যেনো তারা রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার। অথচ একই মিডিয়া অতীতে বিরোধী মতের মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের সময় প্রায় নীরব ছিলো, কখনও কখনও সে নিপীড়নকে বৈধতা দিতেও ভূমিকা রেখেছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সত্যিকারের মানবাধিকারচর্চা, নাকি রাজনৈতিক অবস্থান বদলের কৌশল?

বিচারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। একদিকে জনগণের প্রত্যাশা—ফ্যাসিবাদী শাসনের বিচার হতে হবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও মানবিক বিচার নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা। এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা সহজ নয়। কারণ প্রতিটি সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। জামিন দিলে বলা হচ্ছে সরকার দুর্বল, জামিন না দিলে বলা হচ্ছে প্রতিহিংসা চলছে।

আরও পড়ুন <<>> রাষ্ট্র কি ইচ্ছাকৃতভাবেই দুর্নীতির পাহারাদার হয়ে উঠছে?

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—ন্যায়বিচার মানে প্রতিশোধ নয়। আবার মানবিকতার নামে দায়মুক্তিও নয়। বিচার হতে হবে তথ্য, প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে। আদালত যদি আবেগের চাপে পরিচালিত হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সেটি একটি ভয়াবহ নজির হয়ে থাকবে। একইভাবে সরকার যদি রাজনৈতিক প্রতিশোধের মানসিকতা থেকে বিচার পরিচালনা করে, তবে সেটিও গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত।

আজকের বাংলাদেশ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। এ রাষ্ট্র কি সত্যিই আইনের শাসনের পথে হাঁটবে, নাকি আবারও ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক বিচারব্যবস্থার ফাঁদে আটকে যাবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। যারা অতীতে বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করেছে, তাদের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু সে বিচার হতে হবে এমন, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর আদালতকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানানোর সাহস না পায়।

সবশেষে বলা যায়, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুধু কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্র পুনর্গঠনের একটি পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় সরকার, আদালত, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ—সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে। কারণ আবেগের আদালত সাময়িক সহানুভূতি তৈরি করতে পারে, কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত রায় দেয় তথ্য ও সত্যের ভিত্তিতেই।

লেখক ও সংবাদকর্মী

সম্পর্কিত বিষয়:

জনপ্রিয়

শীর্ষ সংবাদ:

জনগণের দাবি কুমিল্লা বিভাগ হবে: তারেক রহমান
সাত পাসপোর্টসহ সীমান্তে সাবেক কূটনীতিক আটক
নীরবতা সবসময় ক্ষমতার পক্ষে কথা বলে
পাকিস্তানকে বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে দেয়া হবে-ভারতীয় সেনাপ্রধানের হুঁশিয়ারি
‘বিগত স্বৈরাচারের পথেই হাঁটছেন’—বিএনপিকে জামায়াত আমির
মেঘনায় সাবেক ৩ চেয়ারম্যানসহ ৮৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা
যশোরে দামি ইনজেকশন কিনতে গরিবের হিমশিম
মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল-মাঝে
প্যারিস থেকে ফিরছে এক অসমাপ্ত স্বপ্নের লাশ
পে স্কেলের দাবিতে সরকারি চাকরিজীবীদের আলটিমেটাম
কারিনার মৃত্যু গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার অপূরণীয় ক্ষতি: আসিফ মাহমুদ
আবু সাঈদ হত্যা মামলায় বেরোবির সাবেক ভিসি গ্রেফতার
৭ জুন বিসিবি নির্বাচন, তামিমের অ্যাডহক কমিটির অধীনেই ভোট
না ফেরার দেশে কারিনা কায়সার
আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি নিয়ে জামায়াতকে কিছু জানানো হয়নি: জামায়াত আমির