গ্যারান্টি স্কিমঃ ব্যাংক ও উদ্যোক্তার এক সেতু-বন্ধন
অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ঝুঁকি এক অনিবার্য বাস্তবতা। বিনিয়োগ, ঋণ, ব্যবসা সবকিছুতেই অনিশ্চয়তা কাজ করে। কিন্তু এ ঝুঁকির মধ্যেই লুকিয়ে আছে সম্ভাবনা, আর সে সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন আস্থা বা বিশ্বাস। সে আস্থা তৈরি করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্যারান্টি স্কিম ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। বিশেষ করে আমাদের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে, যেখানে উদ্যোক্তাদের বড় অংশই পুঁজি সংকটে ভোগেন।
ব্যাংকে গ্যারান্টি স্কিমকে দেখা হচ্ছে এক ধরনের ‘সেতু-বন্ধন’ হিসেবে, যা ব্যাংক ও উদ্যোক্তার মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে আনে। তবে এ আশাবাদের পাশাপাশি একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার সামনে আসে যে, গ্যারান্টি স্কিম কি সত্যিই ঝুঁকি কমায়, নাকি তা আড়াল করে নতুন ঝুঁকির জন্ম দেয়?
গ্যারান্টি স্কিম হলো এমন একটি আর্থিক ব্যবস্থাপনা যেখানে কোনও তৃতীয় পক্ষ (সাধারণত সরকার বা ব্যাংক) ঋণগ্রহীতার পরিবর্তে ঋণের নিশ্চয়তা প্রদান করে। এটি জামানতবিহীন ঋণ পেতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও স্টার্টআপদের সাহায্য করে। বাংলাদেশে সিএমএসএমই খাতের জন্য ২০,০০০ কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা প্যাকেজের আওতায় এ স্কিম চালু আছে, যা ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি কমায়।
দেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে জামানত একটি প্রধান শর্ত হিসাবে কাজ করে। ফলে নতুন উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা স্টার্টআপরা জামানত যোগাড় করতে পারেনা বিধায় তারা প্রায়ই ঋণ প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হন। এখানে গ্যারান্টি স্কিম একটি কার্যকর সমাধান হিসেবে কাজ করে। যখন কোনও তৃতীয় পক্ষ যেমন সরকার বা একটি বিশেষায়িত তহবিল ঋণের একটি অংশের দায়ভার নেয়, তখন ব্যাংকের ঝুঁকি কমে যায়। এর ফলে উদ্যোক্তরা নতুন ও ঝুঁকিপূর্ণ খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয়। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক চক্র তৈরি হয়। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি, প্রচুর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি পায়, এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এটি একটি বড় সুযোগ। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা স্টার্টআপরা অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যুক্ত হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বৈষম্য কমাতে সহায়তা করে।
কিন্তু এ ইতিবাচক চিত্রের আড়ালে কিছু গভীর ঝুঁকিও লুকিয়ে রয়েছে, যা উপেক্ষা করা বিপজ্জনক। সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ‘মোরাল হ্যাজার্ড’। যখন ঋণগ্রহীতা জানেন যে, তার ঋণের একটি অংশ নিরাপদ, তখন তার ঝুঁকি নেয়ার প্রবণতা অনেকাংশে বাড়তে পারে। সে হয়তো কম পরিকল্পিত বা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে প্রবেশ করতে পারে। একইভাবে ব্যাংকও যদি জানতে পারে যে, ক্ষতির একটি অংশ তাদের বহন করতে হবে না। তাহলে তারা ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন নাও করতে পারে।
এ প্রবণতা যদি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তাহলে তা আর্থিক খাতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে। বিশ্বে আগের ইতিহাসে ঘেটে দেখা গেছে যে, অতিরিক্ত ঝুঁকি গ্রহণ এবং দুর্বল তদারকির কারণে বহু আর্থিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। গ্যারান্টি স্কিম যদি সঠিকভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে এটি সে একই পথের দিকে ঠেলে দিতে পারে। দেশ পড়তে পারে ভয়াবহ আর্থিক ঝুঁকিতে।
এ স্কিমের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজস্ব ঝুঁকি। রাষ্ট্রীয় গ্যারান্টির ক্ষেত্রে, ঋণ খেলাপি হলে তার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপর বর্তায়। এর অর্থ হলো, জনগণের করের টাকা দিয়ে সে ক্ষতি পূরণ করতে হয়। যদি এ ধরনের গ্যারান্টি বড় আকারে দেয়া হয় এবং ঋণ খেলাপির হার বেড়ে যায়, তাহলে তা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করতে পারে। বাজেট ঘাটতি বৃদ্ধি পেতে পারে, উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত হতে পারে, এমনকি মুদ্রাস্ফীতির ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।
এছাড়া গ্যারান্টি স্কিমের বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রকৃত উদ্যোক্তারা এ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন, আর প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক সংযোগসম্পন্ন ব্যক্তি এ সুবিধা ভোগ করেন। এতে করে স্কিমের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বৃদ্ধি পায়। সরকার তার পরিকল্পনা অনু্যায়ী কাজ করতে পারে না, যা দেশের অর্থনীতিতে একটা ঋনাত্মক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ বিষয়গুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। আমাদের দেশের অর্থনীতি এখনও রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শিল্পায়ন, ডিজিটালাইজেশন, এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নের ওপর জোর দেয়া হচ্ছে রাষ্ট্রীয়ভাবে। ঠিক এ সময়ে গ্যারান্টি স্কিম একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত হাতিয়ার হতে পারে।
কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে এর নীতিমালা ও প্রয়োগের ওপর।
- প্রথমত, গ্যারান্টি স্কিমকে এমনভাবে ডিজাইন করতে হবে যাতে ঝুঁকি সম্পূর্ণভাবে স্থানান্তর না হয়ে বরং ভাগাভাগি হয়। হতে হবে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এক নতুন হাতিয়ার। আংশিক গ্যারান্টি এ ক্ষেত্রে একটি কার্যকর পদ্ধতি, কারণ এতে ব্যাংক ও ঋণগ্রহীতা উভয়েরই দায়বদ্ধতা বজায় থাকে।
- দ্বিতীয়ত, শক্তিশালী মনিটরিং ও মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সমকালীন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঋণের ব্যবহার, পরিশোধ এবং কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। যার ফলশ্রুতিতে অনিয়ম ও অপব্যবহার হার বা মাত্রা কমানো সম্ভব।
- তৃতীয়ত, প্রকৃত উদ্যোক্তাদের চিহ্নিত করার জন্য একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া প্রয়োজন। শুধুমাত্র কাগুজে যোগ্যতার ভিত্তিতে নয়, বরং বাস্তব সম্ভাবনা ও দক্ষতার ভিত্তিতে ঋণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে।
- চতুর্থত, ব্যাংকিং খাতে ঝুঁকি মূল্যায়নের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। গ্যারান্টি স্কিম যেনো ব্যাংকের জন্য একটি ‘সহজ পথ’ হয়ে না দাঁড়ায়, বরং একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করে সেটি নিশ্চিত করতে হবে।
সবশেষে, গ্যারান্টি স্কিমকে একটি সাময়িক সহায়তা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, স্থায়ী সমাধান হিসেবে নয়। দীর্ঘমেয়াদে একটি শক্তিশালী, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং দক্ষ আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
আরও পড়ুন <<>> উচ্চশিক্ষায় প্রযুক্তি এবং মানবিকতার সমন্বয়
গ্যারান্টি স্কিম নিঃসন্দেহে অর্থনীতির জন্য একটি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ। এটি উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ দেয়, ব্যাংককে নতুন খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করে, এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করে। তবে এর সঠিক ব্যবস্থাপনা না হলে এটি একই সঙ্গে ঝুঁকির নতুন উৎস হয়ে উঠতে পারে।
এখন সময় এসেছে গ্যারান্টি স্কিমকে শুধুমাত্র একটি আর্থিক সুবিধা হিসেবে না দেখে একটি দায়িত্বশীল নীতিগত কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করার। যেখানে আস্থা থাকবে, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস নয়; যেখানে সুযোগ থাকবে, কিন্তু জবাবদিহিতার ঘাটতি নয়। তাহলেই এ স্কিম সত্যিকার অর্থে ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম করতে পারবে। অন্যদিকে, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট গ্যারান্টি স্কিম তখনই কার্যকর হয়, যখন তা সামগ্রিক আর্থিক সংস্কারের অংশ হিসেবে বাস্তবায়িত হয়।
শুধু গ্যারান্টি প্রদান করলেই হবে না; এর সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায়, গ্যারান্টি স্কিমের পাশাপাশি ক্রেডিট ইনফরমেশন শেয়ারিং, শক্তিশালী রেগুলেটরি তদারকি এবং দ্রুত ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থাও সমান গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশেও এ দিকগুলোকে সমন্বিতভাবে উন্নত করতে হবে।
এছাড়া উদ্যোক্তাদের আর্থিক শিক্ষার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না। অনেক সময় দেখা যায়, শুধু পুঁজি প্রাপ্তিই যথেষ্ট নয়; সে পুঁজির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই গ্যারান্টি স্কিমের আওতায় থাকা উদ্যোক্তাদের জন্য প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং নিয়মিত দিকনির্দেশনা প্রদান করা হলে এর সফলতা আরও বৃদ্ধি পাবে।
সর্বোপরি, গ্যারান্টি স্কিমকে একটি বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখতে হবে। তাহলেই এটি কেবল ঝুঁকি কমানোর উপায় নয়, বরং টেকসই উন্নয়নের একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠবে। গ্যারান্টি স্কিম এর সঠিক প্রয়োগ হতে পারে ব্যাংক ও উদ্যোক্তার জন্য এক সেতু-বন্ধন।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও ব্যাংকার




























