যে ক্ষত শুকায় না
নীরবতা সবসময় ক্ষমতার পক্ষে কথা বলে
গাজায় এখন বাবা-মা রাত হলে সন্তানদের গুনে। ভালোবাসায় নয়—ভোরের শোকের প্রস্তুতিতে। ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে শিশু উঠে আসে। হাসপাতালে ওষুধ নেই। আর পৃথিবী বিবৃতি দিয়ে আবার তার অস্ত্রচুক্তিতে ফিরে যায়। যেন ওই আর্তচিৎকার কেবল একটা ক্ষণিক অসুবিধা। গাজা কোনও ব্যতিক্রম নয়। গাজা একটা আয়না।
বাংলাদেশেও একদিন তরুণেরা রাস্তায় নেমেছিলো। হাতে অস্ত্র নয়। বুকে শুধু বৈষম্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ। তাদের জবাব দেয়া হয়েছিলো গুলিতে। প্রাণ ঝরে গিয়েছিলো সে ফুটপাতে—যে পথ তাদেরই হওয়ার কথা ছিলো। তারপর স্বৈরাচার বিদায় নিয়েছে। কিন্তু স্বৈরতন্ত্র কখনও শুধু একটা মানুষ নয়। শাসক যায়, কিন্তু ব্যবস্থা রয়ে যায়।
বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা আজও নির্বাহী ক্ষমতার ছায়ায় নতমুখে দাঁড়িয়ে। গণভোটের রায় এসেছে। জনতার ইচ্ছা স্পষ্ট। তবু যারা এ ব্যবস্থা থেকে দশকের পর দশক লাভবান, তারা শুধু আসবাব সরিয়েছে। নাম দিয়েছে সংবিধানের ধারাবাহিকতা। যে ঋণখেলাপিরা ঠিকই নির্বাচনী নমিনেশন পায়। দুর্নীতিগ্রস্ত কর্পোরেশন ও সুবিধাভোগী গোষ্ঠী দেশের ব্যাংক লুট করে—সাধারণ মানুষ তাদের সঞ্চয় হারিয়ে দেউলিয়া হয়।
ডাকাতেরা ক্ষণিকের জন্য পর্দার আড়ালে চলে যায়, খুঁজতে থাকে কোনও এক দুর্বল নেতৃত্ব; যথাসময়ে তারা সেটি পেয়েও যায়। তারা অপেক্ষায় থাকে—জনতার ক্ষোভ ও রাস্তার উল্লাস ক্লান্ত হলেই ফিরে আসে আগের আস্তানায়। তারা জানে কীভাবে অপেক্ষা করতে হয়। কীভাবে দুর্বল নেতৃত্বকে ক্ষমতায় বসানো যায়। নাকে তেল দিয়ে সবাই আবার ফিরে যায় পুরোনো ধান্দায়। ফিরে যায় সবকিছু সে আগের কায়দায়। ক্ষোভ মিলিয়ে যায়। ঋণ আর মালিকানা মিলিয়ে যায় না।
কায়রোতে ষাট হাজারেরও বেশি রাজনৈতিক বন্দী কারাগারে পচছে। যে নেতা সিসিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, তাকে জেলে পাঠানো হয়েছে। যারা ফিলিস্তিনের পক্ষে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে, তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে। দুজন কিশোর শুধু দেয়ালে ‘Free Gaza’ লিখেছিলো—তারাও আজ প্রাপ্তবয়স্কদের কারাগারে আটক। এ শাসন টিকে আছে পশ্চিমা ও উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থের জোরে—যারা এ শাসনের পতন হলে কী হবে, সে ভয়ে বাঁচিয়ে রাখছে একটা পচা ব্যবস্থাকে।
আর সুদানে—দেড় লক্ষেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। তিন কোটিরও বেশি মানুষ মানবিক সহায়তার মুখাপেক্ষী। গণকবর এখন মহাকাশ থেকে দৃশ্যমান। দুটো সামরিক গোষ্ঠী—SAF আর RSF—ক্ষমতার জন্য লড়ছে। আর সে যুদ্ধে বাইরে থেকে অস্ত্র ঢুকছে, ভেতর থেকে সোনা বেরিয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ মাঝখানে পিষ্ট। জাতিসংঘের সাবেক মানবিক সহায়তা প্রধান বলেছেন—গাজা আর সুদানের পার্থক্য একটাই: সুদানের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সমাজ উদাসীন। মিডিয়া নীরব। গাজার খবর মিডিয়াতে আসে, কেনোনা অপর পক্ষ পশ্চিমা কর্পোরেট শক্তির চোখের মণি, আদরের ধন।
এ সুতোটাই গাজাকে ঢাকার সঙ্গে জুড়ে দেয়। ঢাকাকে কায়রোর সঙ্গে। কায়রোকে খার্তুমের সঙ্গে। খার্তুমকে নাইরোবি আর কারাকাসের সঙ্গে। আর সবাইকে সে রাজধানীগুলোর সঙ্গে—যারা গণতন্ত্র নিয়ে পৃথিবীকে বক্তৃতা দেয়।
কর্পোরেট গ্রিড আজ সর্বত্র মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। মানুষের স্বপ্ন, শ্রম আর স্বাধীনতার ওপর ছায়া ফেলে। এ গ্রিড—বা লালসা—কোনও এক কোম্পানি নয়। কোনও এক সরকারও নয়। এটা ব্যাংক, আদালত, মিডিয়া, উন্নয়ন প্রকল্প আর আন্তর্জাতিক স্বার্থের সে জাল—যেখানে মানুষ নাগরিক থেকে ধীরে ধীরে কেবল ভোক্তা, শ্রমিক বা পরিসংখ্যানে পরিণত হয়। সে নিজেকে ঘোষণা করে না। এটাই তার সবচেয়ে বড় চাতুর্য। সে বলে উন্নয়ন। বলে বিনিয়োগ। বলে প্রবৃদ্ধি। আর সে শব্দের আড়ালে জেলে হারায় তার নদী। কৃষক হারায় তার জমি। শিক্ষার্থী হারায় সে ভবিষ্যৎ—যার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাকে পড়তে পাঠানো হয়েছিলো।
এ ট্র্যাজেডি শুধু যা ধ্বংস হচ্ছে তার নয়। আরও গভীর ক্ষত হলো—যা কখনও গড়েই উঠতে পারছে না। একটা বিচারব্যবস্থা, যাকে গরিব মানুষ বিশ্বাস করতে পারবে। একটা অর্থনীতি, যা বোঝার সঙ্গে মর্যাদাও বণ্টন করে। একটা রাষ্ট্র, যেখানে গার্মেন্টকর্মী, কৃষক, শিক্ষার্থী—শুধু বেঁচে থাকার অধিকারের জন্য রক্ত না ঝরিয়েও টিকে থাকতে পারে। মনে হয় এসবের অবসান হয়তো কোনোদিনই হবে না।
কিন্তু সম্ভবত এটাই ক্ষমতা চায়। হতাশা হলো নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। যেকোনও সেনাবাহিনীর চেয়ে নির্ভরযোগ্য। যেকোনও দেয়ালের চেয়ে টেকসই। কারণ যে মানুষ বিশ্বাস করে কিছুই বদলাবে না—সে আর রাস্তায় নামে না। তবু মানুষ উঠে দাঁড়ায়। গাজায়। ঢাকায়। কায়রোয়। খার্তুমে। পৃথিবীর প্রতিটি কোণে। তারা ওঠে। দমিয়ে দেয়া হয়। তারা আবার ওঠে।
কারণ বিকল্পটা—নীরবতা—এক ধরনের মৃত্যু, যা শরীর থামার অনেক আগেই এসে যায়। আর নীরব থাকা কখনও নিরপেক্ষ থাকা নয়। নীরবতা সবসময় ক্ষমতার পক্ষে কথা বলে।
সবার দেশ/কেএম




























