Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০৭:২৭, ২৬ মে ২০২৬

আপডেট: ০৭:৩৪, ২৬ মে ২০২৬

ক্ষমতার ১০০ দিন

তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা, সরকারের পরীক্ষা

তারেক রহমান সংযত ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি গড়ে তুললেও তার নেতাকর্মীরা সে বার্তা কতটা ধারণ করছেন, তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। সরকারের সফলতা শুধু প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তায় নির্ভর করে না; দলের প্রতিটি স্তরের আচরণও জনগণের কাছে সরকারের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা, সরকারের পরীক্ষা
ছবি: সংগৃহীত

দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন দৃশ্য খুব বেশি দেখা যায়নি—সরকারপ্রধানের ব্যক্তিগত জীবনযাপন নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এতটা ইতিবাচক আলোচনা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর ক্ষমতায় আসার পর গত ১০০ দিনে তার সাদাসিধে চলাফেরা, তুলনামূলক সংযত ভাষা এবং অহংবর্জিত রাজনৈতিক আচরণ দেশের বহু মানুষকে মুগ্ধ করেছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা, দমন-পীড়ন আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার রাজনীতির অভিজ্ঞতার পর জনগণের একাংশ যেনো একজন ভিন্নধর্মী সরকারপ্রধানকে দেখছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—ব্যক্তি তারেক রহমানের এ ইতিবাচক ভাবমূর্তি কি সরকারের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডেও প্রতিফলিত হয়েছে?

কারণ রাজনীতিতে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা যত গুরুত্বপূর্ণই হোক, শেষ পর্যন্ত জনগণ রাষ্ট্র পরিচালনার ফলাফল দিয়েই সরকারকে মূল্যায়ন করে। আর সেখানেই এখন নানা প্রশ্ন সামনে চলে আসছে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছিলো, তার কেন্দ্রে ছিলো অর্থনৈতিক স্বস্তি, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং কর্মসংস্থান। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা ছিলো—একটি জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা পাবে। কিন্তু সরকারের প্রথম ১০০ দিন পেরিয়ে দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এখনও সাধারণ মানুষের জন্য কঠিনই রয়ে গেছে।

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আসেনি। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে স্বস্তি নেই। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পরিবহন খরচ থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে। বাজারে মানুষের হতাশা স্পষ্ট—সরকার পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু জীবনযুদ্ধের বাস্তবতা বদলায়নি।

অর্থনীতির আরেকটি বড় প্রশ্ন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। নতুন কোনও বড় বিদেশি বিনিয়োগের খবর নেই। শিল্পখাতে আস্থার সংকট এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ফলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি অত্যন্ত ধীর। অথচ জুলাই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি ছিলো বৈষম্যহীন অর্থনীতি ও কর্মের সুযোগ সৃষ্টি। বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিও ছিলো ব্যপক কর্মসংস্থান তৈরির।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার নিজেও স্বীকার করছে, পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি। বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব তৈরি, প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানো এবং থানায় গিয়ে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও গণঅভ্যুত্থানের বিভিন্ন অংশগ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণামূলক মিথ্যা প্রচারণা, রাজনৈতিক হামলা এবং সাংগঠনিকভাবে চাপে রাখার অভিযোগ সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। সমালোচকদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের অনুসারীদের আচরণ অতীতের কর্তৃত্ববাদী রাজনীতির কথাই মনে করিয়ে দিচ্ছে।

চট্টগ্রামে হাসনাত-কে ঘিরে ছাত্রদল-যুবদলের মব, ঝিনাইদহে নাসীরউদ্দিন পাটওয়ারী-র ওপর হামলা, থানায় গিয়ে চাপ সৃষ্টি কিংবা ডাকসুর সাবেক নেতাদের ওপর হামলার মতো ঘটনাগুলো রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকে প্রশ্ন তুলছেন—যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়েছিলো, সে সংস্কৃতিই কি আবার ফিরে আসছে?

তবে সরকারের পক্ষে যুক্তিও কম নয়। বিএনপি নেতারা বলছেন, প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা হাতে পেয়েছে বর্তমান সরকার। অর্থনীতি, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং আর্থিক খাত—সবখানেই ছিলো গভীর সংকট। সে অবস্থা থেকে রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করতে সময় প্রয়োজন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খাদে পড়ে যাওয়া রাষ্ট্রকে ট্র্যাকে ফেরানোর চেষ্টা চলছে। সরকারের দাবি, তারা ইতোমধ্যে প্রশাসনিক সংস্কার, দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তনের কাজ শুরু করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন ১০০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা, সংস্কার উদ্যোগ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জনগণ এখন পরিকল্পনার চেয়ে বাস্তব ফল দেখতে চায়।

সরকারের সবচেয়ে বড় সমালোচনার জায়গা হয়ে উঠেছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্ন। আন্দোলনের সময় এবং নির্বাচনের পুর্বে যেসব সংস্কার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিলো, তার অনেকগুলোই এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার কমিশন শক্তিশালী করা, দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি কিংবা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিয়ে যেসব উদ্যোগের কথা বলা হয়েছিলো, সেগুলোর অনেকই আইনি কাঠামো হারিয়েছে।

বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারানো রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। সমালোচকদের মতে, সরকার যদি সত্যিই সংস্কারের রাজনীতি করতে চাইতো, তাহলে এসব আইন সংসদে উত্থাপন করে স্থায়ী রূপ দিতো।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দলের ভেতরের নিয়ন্ত্রণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে সংযত ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি গড়ে তুললেও মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা সে বার্তা কতটা ধারণ করছেন, তা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা। কারণ সরকারের সফলতা শুধু প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রিয়তায় নির্ভর করে না; দলের প্রতিটি স্তরের আচরণও জনগণের কাছে সরকারের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে দেশে ফেরা তারেক রহমানের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বড় ঘটনা। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরার পর দ্রুত সময়ের মধ্যেই তিনি দেশের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। পরে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মধ্য দিয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার উপস্থিতি আলোচনায় আসে, যখন তিনি টাইম ম্যাগাজিনের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় স্থান পান।

কিন্তু জনপ্রিয়তা ধরে রাখা এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সফল হওয়া এক জিনিস নয়। ইতিহাস বলছে, বিপুল জনসমর্থন নিয়েও অনেক সরকার ব্যর্থ হয়েছে শুধুমাত্র দলের ভেতরের বিশৃঙ্খলা, দুর্বল প্রশাসন এবং প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থতার কারণে।

সে বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন জনগণের আস্থা ধরে রাখা। কারণ মানুষ শুধু একজন সাদাসিধে প্রধানমন্ত্রী চায় না; তারা চায় নিরাপদ জীবন, ন্যায্য বিচার, কর্মসংস্থান এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা। আগামী দিনগুলোতে সরকার এ প্রত্যাশার কতটা জবাব দিতে পারে, সেটিই ঠিক করবে তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা ইতিহাসে স্থায়ী হবে, নাকি তা কেবল একটি ক্ষণিক রাজনৈতিক আবেগ হয়েই থাকবে।

লেখক ও সংবাদকর্মী

শীর্ষ সংবাদ:

তারেক রহমানের জনপ্রিয়তা, সরকারের পরীক্ষা
শান্তি আলোচনার মধ্যেই ইরানে নতুন মার্কিন হামলা
সহকর্মীর স্ত্রীকে বিয়ে, তালাকের পর পুনরায় বিয়ের প্রলোভনে ধর্ষণ
ইসরায়েল ডে প্যারেড বর্জনের ঘোষণা মামদানির
‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে পবিত্র হজ আজ
নরসিংদীতে তৃতীয় লিঙ্গের সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা
নোয়াখালীতে নসিমন উল্টে ব্যবসায়ীর মৃত্যু
বিএনপি আওয়ামী লীগের পথেই হাঁটছে: হাসনাত আবদুল্লাহ
ক্ষিপ্ত মহিষের আক্রমণে প্রাণ গেলো ২ জনের
কোরবানির চামড়া নিয়ে বিপর্যয়ের শঙ্কা
‘গোপন অস্ত্র’ দিয়ে শত্রু ড্রোন ধ্বংসের দাবি ইরানের
ফাঁস হওয়া কলে মাসে ৫০ হাজা ‘মাসোহারা’ দাবি দারোগার
হোয়াইট হাউসের চাপেই পদত্যাগ করছেন তুলসী গ্যাবার্ড
বেনাপোলে ইউনুস হত্যায় সোহেল রানা আটক
নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারীর ওপর হামলা ‘অশোভনীয়’: আইনমন্ত্রী
‘শেষ হয়ে যায়নি আওয়ামী লীগ, আগামী নির্বাচনেই অংশ নিবে’
লালমনিরহাটে আধুনিক পশু জবাইখানার উদ্বোধন
‘নয়ন ভরা জল গো তোমার’ গেয়ে ভাইরাল ফরিদপুরের ‘লাইলী খালা’