মাতৃভাষা: মনস্তত্ত্ব, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়
শিশুর প্রথম অভিজ্ঞতা শব্দ নয়—স্বর। মায়ের কণ্ঠের ওঠানামা, ডাকের ভঙ্গি, স্পর্শের সঙ্গে মিশে থাকা উচ্চারণ, এসব মিলেই তৈরি হয় মানসিক মানচিত্র। সে মানচিত্র থেকেই পরে ভাষা, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়ের ভিত নির্মিত হয়।
আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞান ও বিকাশমূলক মনোবিজ্ঞান বলছে, জীবনের প্রথম কয়েক বছরে মস্তিষ্ক ভাষার প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে। এ সময় যে ভাষা শিশুর চারপাশে প্রধান হয়ে ওঠে, সেটিই তার নিউরাল নেটওয়ার্কে গভীরভাবে গেঁথে যায়। তাই মাতৃভাষা শুধু সাংস্কৃতিক পরিচয় নয়, মস্তিষ্কের গঠনে প্রোথিত এক অভ্যন্তরীণ কাঠামো। ভাষা শেখা মানে কেবল শব্দ শেখা নয়, চিন্তা করবার ধরন শেখা।
মনোবিজ্ঞানী জন বোলবির সংযুক্তি তত্ত্ব আমাদের শেখায়, শিশুর মানসিক নিরাপত্তা নির্ভর করে প্রাথমিক সম্পর্কের উষ্ণতার ওপর। সে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাহন ভাষা। ‘খাচ্ছো না কেনো, জুজু আসবে!’ আবার ‘ভয় পেয়ো না,আমি আছি!’—এ সাধারণ বাক্যগুলো শিশুর কাছে ভয় এবং আশ্বাসের চিহ্ন। এখানে শব্দের অর্থের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ স্বরের বিশ্বাসযোগ্যতা। আর এ বিশ্বাস থেকেই ভাষা হয়ে ওঠে অনুভূতির প্রতীক।
মানুষের জীবনে সংকট এলে একটি অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যায়, সে অবচেতনভাবে নিজের প্রথম ভাষায় ফিরে যায়। বিদেশে দীর্ঘদিন থাকা কেউ হঠাৎ চমকে উঠলে, ব্যথা পেলে বা গভীর আনন্দে অভিভূত হলে তার প্রতিক্রিয়া প্রায়শই মাতৃভাষায় বেরিয়ে আসে। মনস্তত্ত্ববিদরা একে বলেন ‘emotional default language’—আবেগের স্বয়ংক্রিয় ভাষা। আবেগ ও স্মৃতি মস্তিষ্কে যে পথে সংরক্ষিত হয়, সে পথের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শৈশবের ভাষা।
আমরা অতীতকে ভাষার মধ্য দিয়েই পুনর্গঠন করি। গবেষণায় দেখা গেছে, আবেগঘন স্মৃতি যখন মাতৃভাষায় বর্ণনা করা হয়, তখন তা বেশি জীবন্ত ও তীব্র হয়ে ওঠে। কিন্তু একই স্মৃতি যদি দ্বিতীয় ভাষায় বলা হয়, তা কিছুটা দূরবর্তী ও বিশ্লেষণধর্মী শোনায়। তাই ভাষা শুধু প্রকাশের মাধ্যম নয়, অনুভূতির তীব্রতা নিয়ন্ত্রণেরও একটি উপায়।
মানসিক জটিলতা বা ট্রমা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মানুষ কখনও কখনও দ্বিতীয় ভাষা ব্যবহার করতে স্বস্তি বোধ করে। কারণ সে ভাষা তাকে অনুভূতি থেকে সামান্য দূরত্ব দেয়। আবার গভীর আত্মস্বীকারোক্তির মুহূর্তে মানুষ অজান্তেই ফিরে আসে তার শেকড়ের ভাষায়। ভাষার এ দ্বৈত ভূমিকা, সংযোগ ও দূরত্ব—মানবমনের সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য।
ভাষাতাত্ত্বিক এডওয়ার্ড সাপির ও বেঞ্জামিন লি ওরফ যে তত্ত্ব দিয়েছেন, তা আজও প্রাসঙ্গিক। তাদের মতে, ভাষা আমাদের চিন্তার কাঠামো নির্ধারণ করে। আমরা যে ভাষায় পৃথিবীকে দেখি, সে ভাষাই বাস্তবতাকে নির্দিষ্টভাবে সাজিয়ে দেয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—কোনও ভাষায় যদি আবেগ, সময় বা সম্পর্কের সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝাতে আলাদা শব্দভাণ্ডার থাকে, তাহলে সে ভাষাভাষী মানুষ স্বাভাবিকভাবেই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো বেশি সচেতনভাবে অনুভব করে।
আরও পড়ুন <<>> ভাষা নিয়ে ভাসাভাসা কথা: ভাষা দিবস ও রাজনীতির ভাষা
অর্থাৎ মাতৃভাষা আমাদের শুধু কথা বলতে শেখায় না, আমাদের চিন্তার দৃষ্টিকোণও নির্ধারণ করে। ব্যক্তির মানসিক জগত এবং জাতির সম্মিলিত চেতনা দুটোই ভাষার ভেতরে সংরক্ষিত থাকে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন শুধু রাষ্ট্রভাষার দাবি নয় এটা ছিলো আত্মপরিচয়ের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। ভাষার জন্য আত্মত্যাগের স্মৃতি আমাদের সমষ্টিগত চেতনায় গভীরভাবে গেঁথে আছে। এ ইতিহাস আমাদের শেখায়—ভাষা যখন আক্রান্ত হয়, তখন আত্মমর্যাদাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।
আধুনিক বিশ্বে অনেকেই দ্বিভাষিক বা বহুভাষিক। এতে করে মানসিক নমনীয়তা বাড়ে, চিন্তার ভিন্ন ভিন্ন কাঠামো তৈরি হয়। কিন্তু গবেষণা বলছে, যত ভাষাই শিখি না কেনো, আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে মাতৃভাষাই থাকে।
মাতৃভাষাগুলো বেঁচে থাকুক, মানবসভ্যতার বহুস্বরের পরিচয় হয়ে।
লেখক: ব্যাংকার




























