আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে তানভীরের বিস্ফোরক দাবি
‘রাতে বাইরে, ভোরে কারাগারে-এটা দেখাই আমার জন্য কাল হয়েছে’
কারাগারে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাদের রাতে গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ভোরে আবার ফিরিয়ে আনা হয় বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে অব্যাহতি পাওয়া যুগ্ম সদস্যসচিব গাজী সালাউদ্দিন তানভীর। কারাগারে নিজের ওপর অমানবিক নির্যাতন ও চিকিৎসার নামে অপচিকিৎসার অভিযোগও করেছেন তিনি।
শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন তানভীর। অসুস্থতার কারণে তিনি নিজে কথা বলতে না পারায় তার লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য ইয়াসির আরাফাত।
তানভীর বলেন, কারাগারে যে কক্ষে তাকে রাখা হয়েছিলো, সেখান থেকে আওয়ামী লীগের নেতাদের থাকার জায়গা দেখা যেত। তার দাবি, তারা কারাগারে ভালো অবস্থায় ছিলেন, ফোনে কথা বলতেন, ভালো খাবার খেতেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত দেখা করার সুযোগ পেতেন।
তিনি বলেন,
রাতের বেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের গাড়িতে করে বাইরে নেয়া হয় এবং ভোরে আনা হয়, এটা আমি দেখেছি। এ দেখাটাই হয়তো আমার জন্য কাল হয়েছে।
কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ
লিখিত বক্তব্যে তানভীর দাবি করেন, গত ৫ আগস্ট থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কারাগার ও রিমান্ডে তাকে চরম নির্যাতন করা হয়েছে। এ সময় তাকে হুমকিও দেয়া হয়। নির্যাতনের কথা বাইরে বললে তার পরিবারের সদস্যদের গুম করে ফেলার হুমকি দেয়া হয়েছিলো বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তানভীর বলেন, এরপরও আপনাদের সামনে সত্যটা তুলে ধরতে এসেছি। আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পাই না। সত্য সবার সামনে তুলে ধরতে চাই।
তিনি আরও দাবি করেন, কারাগারে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রযন্ত্র ও সরকারের মধ্যে আগের আমলের ‘কালো ছায়া’ এখনও রয়েছে বলে মনে করেছেন। জীবনের ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও বিষয়গুলো সামনে আনতে সংবাদ সম্মেলনে এসেছেন বলেও জানান তিনি।
কারাগারের পরিবেশ ও খাবার নিয়ে অভিযোগ
তানভীরের দাবি, ৫ আগস্ট তাকে বগুড়া কারাগারের একটি অপরিচ্ছন্ন, আলো-বাতাসহীন সেলে রাখা হয়। সেখানে বিদ্যুৎ বা ফ্যান ছিলো না। কারারক্ষীদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেন তিনি। তাদের অনেকে তাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে গালিগালাজ করতেন বলে দাবি করেন।
কারাগারে খাবারের মান নিয়েও অভিযোগ করেন তানভীর। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসে অন্যদের ভালো খাবার দেয়া হলেও তাকে দুই দিনের পুরোনো খাবার দেয়া হয়। পরবর্তী সময়ও তাকে পচা-বাসি খাবার দেয়া হতো, যা খাওয়ার উপযোগী ছিলৈা না বলে দাবি করেন তিনি।
চিকিৎসা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ
তানভীর জানান, একপর্যায়ে তিনি ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে তাকে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক যে ওষুধ লিখেছিলেন, তা না দিয়ে অজ্ঞাত ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, শরীরে ৭০ থেকে ৮০টি ইনজেকশন দেয়া হয়েছে। এসব ইনজেকশন কীসের ছিলো, তা তাকে জানানো হয়নি। সারাক্ষণ জ্বর থাকলেও তাকে ইনজেকশন দেয়া হতো বলে জানান তিনি।
তানভীর বলেন, একদিন হাত-পা কাঁপতে শুরু করলে চিকিৎসক তাকে ইনজেকশন দেন। এরপর তার ডান হাত ও ডান পা অবশ হয়ে যায়। পরে তাকে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক স্ট্রোক হয়েছে বলে জানান বলে দাবি করেন তিনি। তবে কারা কর্তৃপক্ষ তার স্ট্রোক হয়নি বলে জানায় বলেও অভিযোগ করেন তানভীর।
তার আরও দাবি, সিটি স্ক্যান করানো হলেও রিপোর্ট তাকে জানানো হয়নি। পরে এমআরআই করার কথা বলা হয়। হাসপাতালের এমআরআই মেশিন নষ্ট থাকার কথা বলা হলেও তাকে ওই মেশিনে নেয়া হয়।
তানভীরের ভাষ্য, মেশিনের ভেতরে থাকা অবস্থায় বিকট শব্দ হয়ে সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে যায় এবং তিনি ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা অচেতন ছিলেন। পরে জ্ঞান ফিরলে নিজেকে হাসপাতালের প্রিজন সেলে দেখতে পান বলে জানান তিনি।
ঢাকায় এনে নির্যাতনের অভিযোগ
উন্নত চিকিৎসার কথা বলে পরে তাকে ঢাকায় আনা হয়। কেরানীগঞ্জের সেলের পরিবেশ নিয়েও অভিযোগ করেন তানভীর। পিজি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নেয়া হলেও তাকে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
হাসপাতাল থেকে কারাগারে ফেরার সময় সাদা পোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি গাড়িতে উঠে তাকে নির্যাতন করেন বলেও অভিযোগ করেন তানভীর। তার দাবি, নির্যাতনের সময় এনসিপির নেতা নাসীরুদ্দিন পাটওয়ারী, আসিফ মাহমুদ ও সালাহউদ্দিন আম্মারের নাম উল্লেখ করে ‘জুলাইয়ের সবাইকে’ একইভাবে নির্যাতন করা হবে বলে হুমকি দেয়া হয়।
বর্তমান শারীরিক অবস্থার কথা জানিয়ে তানভীর বলেন, নির্যাতনের কারণে এখন তাকে প্রস্রাব-পায়খানার জন্য ব্যাগ ও প্যাড ব্যবহার করতে হচ্ছে। তিনি একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি আছেন এবং তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে।
বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি করেন তিনি।
মামলা ও কারাগারে যাওয়ার ঘটনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে আপত্তিকর ও মানহানিকর পোস্ট দেয়ার অভিযোগে সাইবার সুরক্ষা আইনের মামলায় গত ৫ আগস্ট ঢাকার পূর্ব মনিপুর এলাকা থেকে গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে গ্রেফতার করা হয়। তার লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে ২ আগস্ট তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিলো। মামলার বাদী বগুড়া সদর থানা বিএনপির সভাপতি এইচ এস মাফুতুন আহমেদ খান বলে জানান তিনি।
গ্রেফতারের পর ১০ আগস্ট তাকে বগুড়া সদর থানা পুলিশ রিমান্ডে নেয়। রিমান্ডে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেয়া হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তত্ত্বাবধানে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও চিকিৎসা দেয়া হয়।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান তানভীর।
দল থেকে অব্যাহতির পেছনে ফেসবুক পোস্ট
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেয়ার পর ‘গুরুতর সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ অভিযোগে গত ১ আগস্ট গাজী সালাউদ্দিন তানভীরকে দলীয় দায়িত্ব থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেয় এনসিপি।
এর আগে ২০২৫ সালের ২১ এপ্রিলও তাকে সাময়িক অব্যাহতি দেয়া হয়েছিলো। তখন জেলা প্রশাসক নিয়োগে অবৈধ হস্তক্ষেপ এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের পাঠ্যবই ছাপার কাগজে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছিলেন তিনি। এসব বিষয়ে তাকে সাত দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছিলো। পাশাপাশি তাকে কেনো দল থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে না, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিলো।
প্রায় এক বছর পর তার সাময়িক অব্যাহতির আদেশ প্রত্যাহার করে নেয় এনসিপি।
তানভীরের সংবাদ সম্মেলনে করা কারাগারে নির্যাতন, চিকিৎসায় অনিয়ম এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের বিশেষ সুবিধা দেয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কারা কর্তৃপক্ষ বা অভিযুক্তদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
সবার দেশ/কেএম




























