পুত্র পরীক্ষার্থী-পাহারায় শিক্ষক পিতা, প্রিন্সিপ্যাল খুরশিদ জাহানের স্বেচ্ছাচারিতা
রাজধানীর দিয়াবাড়ি এলাকায় অবস্থিত মেগাসিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছেন বিজ্ঞান বিভাগের এক প্রার্থী। তার কেন্দ্র পড়েছে তুরাগ থানাধীন কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে। আর এ কেন্দ্রের শিক্ষক হচ্ছেন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর পিতা গণিতের শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) এসএসসি পরীক্ষার ছিলো প্রথম দিন। সকাল ১০টার দিকে দেখা গেছে, শিক্ষক ছানোয়ার হোসেন তার প্রার্থী পুত্রের সঙ্গে কেন্দ্রের ভেতর কথা বলছেন। একবার বাইরে যাচ্ছেন আর কেন্দ্রের ভেতরে আসছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরীক্ষা শুরুর আগের রাতেও ছানোয়ার হোসেনকে দেখা গেছে কেন্দ্র প্রধান খুরশিদ জাহানের সঙ্গে শলাপরামর্শ করতে। আজ পরীক্ষার সময় দেখা যায় তার পুত্র এ কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী শাকিলের সঙ্গে কথা বলছেন। তাকে নানা রকম নির্দেশনা দিচ্ছেন। অথচ এ শিক্ষককে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনও পরীক্ষার কোনো ডিউটিতে রাখা হয়নি।
কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র সূত্র জানায়, এবার এ কেন্দ্রে উত্তরা দিয়াবাড়িতে অবস্থিত মেগাসিটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ, লাইট হাউজ, কিশলয় এবং রাজাবাড়ি কিন্ডারগার্টেসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ৯শ’ ৯১ জন পরীক্ষার্থীর সিট পড়েছে কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রে।
সরকারি নির্দেশনা রয়েছে, যে শিক্ষক কেন্দ্র পরিচালনা কমিটি কিংবা ডিউটিতে নেই তিনি কেন্দ্রে অবস্থান করতে পারবেন না। এ নির্দেশনাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্র। কেন্দ্র প্রধান খুরশিদ জাহান স্বেচ্ছাচারিতার আশ্রয় নিয়ে পরিচালনা করছেন কেন্দ্রটি।
জানাগেছে, পরীক্ষার আগের রাতে কেন্দ্রপ্রধান খুরশিদ জাহানের অফিস ছিলো খোলা। সব শিক্ষক ও কর্মচারিদের বের করে দিয়ে এখানে অনেক রাত অবধি অজ্ঞাতনামা বহিরাগতদের নিয়ে চলে বৈঠক। তাদের মাধ্যমে কেন্দ্রের অনেক গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়া হয়েছে-মর্মে জানা গেছে।
কেন্দ্রে সিট পড়া পরীক্ষার্থীদের মধ্যে কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের গণিতের শিক্ষক ছানোয়ার হোসেনের পুত্র বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাকিলও রয়েছেন। পরীক্ষায় তার কোনও ডিউটি না থাকলেও সকাল ১০টা পর্যন্ত ছেলের সঙ্গে কেন্দ্রের ভেতর তাকে দেখা গেছে। খুরশিদ জাহান অনিয়ম করবেন বিধায় কৌশলে কয়েকজন শিক্ষককে পরীক্ষার ডিউটি থেকে সরিয়ে রাখেন। প্রধান শিক্ষকের পরপরই দায়িত্বশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সহকারি প্রধান শিক্ষক। কিন্তু খুরশিদা রহস্যজনক কারণে সহকারি প্রধান শিক্ষক অনরুন কুমারকে পরীক্ষা সংক্রান্ত কমিটির বৈঠক ও ডিউটি থেকে দূরে রাখেন। পরীক্ষা চলাকালে তাকে কামারপাড়া হাইস্কুল কেন্দ্রে দেখা যায় নি।
কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজ গভর্ণিং বডির রেজুলেশন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র শিক্ষক (বিজ্ঞান) সুরুজ মিয়া শিফট ইনচার্জ। কিন্তু খুরশিদ জাহান তাকে বসিয়ে রেখে কোনও ধরণের রেজুলেশন ছাড়াই শিফট ইন চার্জের দায়িত্ব দেন সমাজ-বিজ্ঞানের শিক্ষক ওয়াসিমউদ্দিনকে। চলতি মাসের ৩০ তারিখে তার অবসর-পূর্ব ছুটিতে যাওয়ার কথা। অথচ তাকে রাখা হয়েছে শিফট ইনচার্জ করে। কোনও ধরণের কারণ না দেখিয়েই স্পষ্টভাষী কয়েকজন শিক্ষককে কেন্দ্র পরিচালনা কমিটিতে রাখা হয়নি। দেয়া হয়নি কোনও ডিউটিও।
এ বিষয়ে কামারপাড়া হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারি প্রধান শিক্ষক অরুন কুমার বলেন, খুরশিদ জাহান তার ইচ্ছে মতো পরীক্ষা পরিচালনা কমিটি করেছেন। নানা কায়দা করে তার ঘনিষ্ট শিক্ষকদের কমিটি কিংবা ডিউটিতে রেখে দিয়েছেন। এ ধরণের কমিটিতে আমি থাকতে পারি না। এ কারণে আমাকে কোনও ডিউটিতেও রাখা হয়নি। আমি সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত কেন্দ্রে অবস্থান করে বাসায় চলে এসেছি।
আরেক সহকারি শিক্ষক শাম্মি আক্তার বলেন, আমি হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেছি সকালে। নিয়ম অনুযায়ী আমার ডিউটি সকাল সাড়ে ৯ থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত। আমাকে কোনও ডিউটিতেই রাখা হয়নি। বরং খুরশিদ জাহান আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করেছেন। পরে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পুলিশ দিয়ে আমাকে কেন্দ্র থেকে বের করে দেয়া হয়। ডিউটি দিলে শিক্ষকদের কিছু আর্থিক উপকার হয়। আমি যাতে আর্থিক কোনও সুবিধা পেতে না পারি এ কারণে ডিউটিতে রাখা হয়নি।
এদিকে কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাধিক অভিভাবক খুরশিদ জাহানের বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা জানান, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা পালিয়ে যান। এর পরপরই আত্মগোপনে চলে যান ফ্যাসিস্টের দোসর, কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়মের মাস্টারমাইন্ড খুরশিদ জাহান। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে তিনি কোত্থেকে যেনো উদয় হয়ে পুনরায় কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে জোরপূর্বক পুন:প্রবেশ করেন। পরে নিজেকে স্বঘোষিত প্রিন্সিপ্যাল দাবি করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপি’র তুরাগ থানার যুগ্ম আহ্বায়ক হাজী জহিরুল ইসলামকে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে তিনি স্কুলে পুন:প্রবেশ করেন এবং প্রিন্সিপালের কক্ষ পুনর্দখল করেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কেন্দ্র প্রধান খুরশিদ জাহান বলেন, তার বিরুদ্ধে সকল অভিযোগ মিথ্যা। তার ভাষায়, একজন খন্ডকালীন শিক্ষক শত্রুভাবাপন্ন হয়ে তার বিরুদ্ধে এমন মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালাচ্ছেন।
সবার দেশ/কেএম




























