রয়টার্সের প্রতিবেদন
হোয়াইট হাউসের চাপেই পদত্যাগ করছেন তুলসী গ্যাবার্ড
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র ও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অনুগত হিসেবে পরিচিত তুলসী গ্যাবার্ড শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউসের চাপের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক (ডিএনআই) পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে ট্রাম্পকে জানিয়েছেন গ্যাবার্ড। গত ২২ মে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন। আগামী ৩০ জুন দায়িত্ব ছাড়বেন বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
পদত্যাগের কারণ হিসেবে গ্যাবার্ড জানিয়েছেন, তার স্বামীর ক্যানসার ধরা পড়েছে এবং পরিবারের পাশে সময় দেয়ার প্রয়োজন থেকেই তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, এর আড়ালে মূল কারণ ছিলো হোয়াইট হাউসের ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক চাপ ও মতপার্থক্য।
বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থানের সঙ্গে গ্যাবার্ডের মতবিরোধই তাকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প প্রশাসন চাইছিলো গ্যাবার্ড প্রকাশ্যে এমন অবস্থান নিন, যাতে বোঝানো যায়—ইরান খুব দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের পথে রয়েছে। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়নের ভিত্তিতে গ্যাবার্ড বারবার বলেছেন, ইরান এখনও পারমাণবিক বোমা তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।
২০২৫ সালের মার্চে কংগ্রেসে দেয়া সাক্ষ্যে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইরান বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। তার এ বক্তব্য সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
পরে সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে ট্রাম্প প্রকাশ্যেই বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সে কী বলেছে, তাতে আমার কিছু যায় আসে না। আমার বিশ্বাস, তারা খুব কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলো।
এর পর থেকেই জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক ও কৌশলগত আলোচনায় গ্যাবার্ডকে ধীরে ধীরে উপেক্ষা করা শুরু হয়। ইরান ইস্যুতে হোয়াইট হাউসের একাধিক বৈঠকে তাকে ডাকা হয়নি। এমনকি কংগ্রেসকে দেয়া কয়েকটি গোপন ব্রিফিং থেকেও তাকে দূরে রাখা হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গ্যাবার্ড বরাবরই বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সমালোচক ছিলেন। ইরাক যুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তনের মার্কিন নীতির বিরোধিতা করেছেন তিনি। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের কট্টরপন্থী অংশের কাছে তিনি ধীরে ধীরে অস্বস্তিকর ব্যক্তিত্বে পরিণত হন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, চলতি বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার একটি গোপন পরিকল্পনা নিয়েও প্রশাসনের ভেতরে আলোচনা চলছিলো। তবে বিদেশে সরকার পরিবর্তনের অভিযানের বিরোধী হওয়ায় সে পরিকল্পনা থেকেও গ্যাবার্ডকে দূরে রাখা হয়।
এদিকে গ্যাবার্ডের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টারের পরিচালক জো কেন্টও পদত্যাগ করেন। ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করে দেয়া পদত্যাগপত্রে তিনি লেখেন, বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে আমি এ যুদ্ধকে সমর্থন করতে পারি না।
২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প নিজেকে ‘যুদ্ধবিরোধী নেতা’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, নতুন কোনও যুদ্ধ শুরু করবেন না এবং চলমান সংঘাত কমিয়ে আনবেন। কিন্তু দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর কারণে সে অবস্থান নিয়েই এখন প্রশ্ন উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তুলসী গ্যাবার্ড এমন এক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন, যা একসময় ট্রাম্পের রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলো, কিন্তু বর্তমান প্রশাসনিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক ইস্যুতে তার তথ্যভিত্তিক ও সতর্ক অবস্থান হোয়াইট হাউসের যুদ্ধপন্থী অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। যদিও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) এবং বিভিন্ন মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তার মূল্যায়নেও বলা হয়েছে, ইরান উচ্চমাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করলেও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন সুস্পষ্ট প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
তবু ট্রাম্প প্রশাসন ধারাবাহিকভাবে দাবি করে আসছিলো, ইরান খুব দ্রুত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের পথে রয়েছে। আর সে অবস্থানের সঙ্গে একমত না হওয়াতেই শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার বলয়ে নিজের জায়গা হারান তুলসী গ্যাবার্ড।
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলের অনেকে মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনে টিকে থাকতে শুধু আনুগত্য যথেষ্ট নয়; প্রেসিডেন্টের অবস্থানের সঙ্গে নিঃশর্তভাবে একমত থাকাও সেখানে বড় শর্ত। আর সে জায়গাতেই শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে পড়েন তুলসী গ্যাবার্ড।
সূত্র: রয়টার্স
সবার দেশ/কেএম




























