১৩২ বলে ০ রান, তবু ম্যাচের নায়ক তিনি!
সব ইনিংসের সাফল্য স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না। কোনও কোনও দিন শূন্য রানেও দলের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান অবদান রাখা যায়—ম্যাক্স ফিল্ডের এ ইনিংস যেন সে কথাই আবারও মনে করিয়ে দিলো।
টি-টোয়েন্টির ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের যুগে অবিশ্বাস্য ধৈর্যের নজির গড়লেন অস্ট্রেলিয়ার ম্যাক্স ফিল্ড। ১৩২ বল খেলেও করেননি কোনও রান, তার দৃঢ়তায় ড্র হয়েছে ম্যাচ।
চার-ছক্কার ফুলঝুরি, চোখধাঁধানো স্ট্রোক আর দ্রুত রান তোলার প্রতিযোগিতা—আধুনিক ক্রিকেটে ব্যাটারদের সাফল্য মাপার অন্যতম মাপকাঠি এখন রান ও স্ট্রাইক রেট। তবে ক্রিকেটের সৌন্দর্য যে শুধু রান করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কখনও কখনও উইকেট আগলে রাখাও যে হতে পারে অসাধারণ কৃতিত্ব, তা নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া ক্রিকেটার ম্যাক্স ফিল্ড।
ব্যাট হাতে ক্রিজে থেকেছেন ১৩২ বল। অথচ স্কোরবোর্ডে তার নামের পাশে যোগ হয়নি একটিও রান। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এ শূন্য রানই হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। দলের বিপদে উইকেট আঁকড়ে থেকে ম্যাচ বাঁচানোর দায়িত্ব পালন করে আলোচনায় এসেছেন ইস্টার্ন সাবআর্বসের এ ওপেনার।
১৩২ বলের ধৈর্যের পরীক্ষা
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলসের লর্ন পার্কে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দুই দিনের দ্বিতীয় গ্রেডের জেলা ক্রিকেট ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল নর্দার্ন সাবআর্বস ও ইস্টার্ন সাবআর্বস। ম্যাচের শেষ দিকে ইস্টার্নের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো পরাজয় এড়িয়ে যাওয়া। সে পরিস্থিতিতে দলের হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ওপেনার ম্যাক্স ফিল্ড।
প্রতিপক্ষের বোলারদের লক্ষ্য ছিলো দ্রুত উইকেট তুলে নিয়ে জয় নিশ্চিত করা। অন্যদিকে ফিল্ডের কাছে তখন রান তোলার চেয়ে উইকেট ধরে রাখাই ছিলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বোলারদের একের পর এক বল মোকাবিলা করেও তিনি নিজের উইকেট হারাননি।
১৩২ বল খেলে শূন্য রানে অপরাজিত থাকার এ ঘটনা ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে হয়ে উঠেছে বিরল ধৈর্যের উদাহরণ। যেখানে দ্রুত রান তোলার জন্য ব্যাটাররা প্রতিনিয়ত নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন, সেখানে ফিল্ড দেখিয়েছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক ব্যাটিং দর্শন—পরিস্থিতির দাবি মেনে উইকেট বাঁচিয়ে রাখাই কখনো দলের জন্য সবচেয়ে বড় অবদান হতে পারে।
৪৫৪ রান করেও জয় পেল না নর্দার্ন
ম্যাচের শুরুতে ব্যাট হাতে দাপট দেখিয়েছিল নর্দার্ন সাবআর্বস। প্রথম ইনিংসে ৭ উইকেটে ৪৫৪ রান তুলে ইনিংস ঘোষণা করে দলটি। বড় এই সংগ্রহের পর ইস্টার্ন সাবআর্বস ব্যাট করতে নেমে প্রথম ইনিংসে অলআউট হয় ২০৩ রানে। ফলে ফলোঅনে পড়ে তারা।
দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নেমে ইস্টার্নের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় পরাজয় এড়ানো। দলের হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলার দায়িত্ব নেন ফিল্ড। তার দীর্ঘ সময় উইকেটে টিকে থাকার পাশাপাশি দলের অন্য ব্যাটারদের প্রচেষ্টায় দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৬ ওভারে ৬৬ রান তোলে ইস্টার্ন।
শেষ পর্যন্ত দুই অধিনায়ক ড্র মেনে নেন। ফলে বড় সংগ্রহ গড়েও জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারেনি নর্দার্ন সাবআর্বস।
শূন্য রানেও কেনো নায়ক?
ক্রিকেটে সাধারণত সেঞ্চুরি, দ্রুততম অর্ধশতক কিংবা ছক্কার রেকর্ডই শিরোনাম হয়। কিন্তু ফিল্ডের ইনিংস মনে করিয়ে দিয়েছে, ক্রিকেটে সব সময় ব্যক্তিগত রানই সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী দলের প্রয়োজন মেটানোও একজন ব্যাটারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
বিশেষ করে দুই দিনের ক্রিকেটে, যেখানে সময় ও উইকেটের হিসাব অনেক সময় রানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, সেখানে দীর্ঘক্ষণ ব্যাট করে প্রতিপক্ষকে জয় থেকে বঞ্চিত করা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
ম্যাক্স ফিল্ডের ১৩২ বলে শূন্য রানের ইনিংস তাই নিছক ব্যর্থতার পরিসংখ্যান নয়; বরং ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে খেলার এক ব্যতিক্রমী উদাহরণ। তার এ ধৈর্যশীল ব্যাটিং সোশ্যাল মিডিয়ায়ও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ক্রিকেটপ্রেমীদের অনেকে তাকে টেস্ট ক্রিকেটের প্রকৃত চেতনার প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
সব ইনিংসের সাফল্য স্কোরবোর্ডে লেখা থাকে না। কোনও কোনও দিন শূন্য রানেও দলের জন্য সবচেয়ে মূল্যবান অবদান রাখা যায়—ম্যাক্স ফিল্ডের এ ইনিংস যেন সে কথাই আবারও মনে করিয়ে দিলো।
সবার দেশ/এমকেজে




























