থাকছে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমাধানও
২৫ টাকা ইউনিটের বিদ্যুতে মিলবে সাত সুবিধা
চীনা একটি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঢাকার আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ প্রতি ইউনিট ২৫ টাকা দরে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সাধারণ বিদ্যুতের তুলনায় এ দাম বেশি হলেও প্রকল্পটির মাধ্যমে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন নয়, ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা, জৈব সার উৎপাদন ও কার্বন ক্রেডিটসহ একাধিক সুবিধা পাওয়ার কথা বলছে সরকার।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এ প্রকল্পে বাংলাদেশ সরকারকে কোনও বিনিয়োগ করতে হবে না। একই সঙ্গে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির জন্য কোনও ক্যাপাসিটি চার্জও দিতে হবে না বলে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনের সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান প্রতিমন্ত্রী।
৪২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা
আমিনবাজারের বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পটির উৎপাদন সক্ষমতা হবে ৪২ মেগাওয়াট। পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্পটি উৎপাদনে যাওয়ার কথা রয়েছে। সে হিসাবে ২০২৮ সালের আগস্ট বা সেপ্টেম্বর নাগাদ উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য ২৫ টাকা দিতে হবে। বিদ্যুতের দাম তুলনামূলক বেশি হলেও প্রকল্পটির সামগ্রিক সুবিধা বিবেচনায় এটি যৌক্তিক বলে মনে করছে সরকার।
বিদ্যুতের পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
প্রকল্পটির অন্যতম বড় সুবিধা হলো ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে এটি ভূমিকা রাখবে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বর্জ্য আমিনবাজারের ল্যান্ডফিলে জমা হওয়ায় সেখানে জায়গার সংকটের পাশাপাশি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
বর্জ্যকে সরাসরি ল্যান্ডফিলে ফেলার পরিবর্তে তা প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, অন্যদিকে ল্যান্ডফিলে বর্জ্যের চাপও কমবে।
শুধু বিদ্যুৎ নয়, তৈরি হবে জৈব সার
প্রকল্পটির আওতায় বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি জৈব সারও তৈরি করা হবে। অর্থাৎ একই বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও সার—দুই ধরনের সম্পদ তৈরির সুযোগ থাকছে।
এতে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ কমানোর পাশাপাশি বর্জ্যকে অর্থনৈতিকভাবে ব্যবহার করার সুযোগ তৈরি হবে। ফলে ২৫ টাকা ইউনিট দরে বিদ্যুৎ কেনার বিষয়টি শুধু বিদ্যুতের মূল্য দিয়ে বিবেচনা না করে পুরো প্রকল্পের আর্থিক ও পরিবেশগত সুফল বিবেচনা করতে হবে বলে মনে করছে সরকার।
বাংলাদেশের বিনিয়োগ লাগবে না
এ প্রকল্পে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সুবিধাগুলোর একটি হলো সরকারকে কোনও বিনিয়োগ করতে হবে না। চীনা বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে।
অর্থাৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও উৎপাদন কার্যক্রমের জন্য সরকারের সরাসরি বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না। ফলে সরকারি অর্থ ব্যয় না করেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ক্যাপাসিটি চার্জও নেই
প্রকল্পটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারকে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে না। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতার জন্য বিদ্যুৎ না নিলেও যে নির্দিষ্ট অর্থ দিতে হয়, সেটিই মূলত ক্যাপাসিটি চার্জ।
এ প্রকল্পে ক্যাপাসিটি চার্জ না থাকায় সরকারকে বিদ্যুৎ না পেলেও কেন্দ্রের সক্ষমতার জন্য আলাদা অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। ফলে ২৫ টাকা ইউনিটের তুলনামূলক বেশি বিদ্যুৎমূল্যের বিপরীতে এ বিষয়টি সরকারের ব্যয়ের চাপ কমাবে।
কার্বন ক্রেডিটের সুবিধা
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশগত সুবিধার পাশাপাশি প্রকল্প থেকে কার্বন ক্রেডিট পাওয়ারও সুযোগ রয়েছে। ল্যান্ডফিলে বর্জ্য ফেলার পরিবর্তে তা প্রক্রিয়াজাত করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। এর বিপরীতে আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে কার্বন ক্রেডিট অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী মনে করেন, বিদ্যুতের দাম বেশি হলেও বর্জ্য অপসারণ, পরিবেশগত সুবিধা এবং কার্বন ক্রেডিটের মূল্য বিবেচনায় নিলে প্রকল্পটির খরচ অনেকটাই পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হবে।
ল্যান্ডফিলের জন্য সিটি করপোরেশন পাবে ভাড়াও
প্রকল্পটির মাধ্যমে সিটি করপোরেশন আরও একটি আর্থিক সুবিধা পাবে। বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান আমিনবাজারের ল্যান্ডফিল ব্যবহারের জন্য সিটি করপোরেশনকে নিয়মিত মাসিক ভাড়া দেবে।
অর্থাৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য যে জমি ও ল্যান্ডফিল ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটি থেকে সিটি করপোরেশনের আয়ও হবে। একই সঙ্গে ওই বর্জ্যই বিদ্যুৎ ও জৈব সার উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
দক্ষিণ ঢাকার বর্জ্য থেকেও বিদ্যুৎ
আমিনবাজারের পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ল্যান্ডফিলে জমে থাকা বর্জ্য ব্যবহার করেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সেখানে প্রতিদিন আরও ৪০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চীনের ‘পাওয়ার চায়না’ নামে আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে আমিনবাজারের প্রকল্পটিকে শুধু বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি হিসেবে দেখছে না সরকার। ২৫ টাকা ইউনিট দরে বিদ্যুৎ কেনার পাশাপাশি বাংলাদেশ বিনা বিনিয়োগে বিদ্যুৎ উৎপাদন, ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে মুক্তি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুযোগ, জৈব সার উৎপাদন, ল্যান্ডফিল ব্যবহারের ভাড়া এবং সম্ভাব্য কার্বন ক্রেডিট—সব মিলিয়ে বহুমুখী সুবিধা পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সবার দেশ/কেএম




























