প্রজ্ঞা-আত্মা’র আলোচনা সভা
তামাক করকাঠামো সংস্কারে বাড়বে রাজস্ব, দাবি বিশেষজ্ঞদের
তামাক করকাঠামো কার্যকরভাবে সংস্কার করা হলে একদিকে যেমন জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন সম্ভব, অন্যদিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সিগারেটের মূল্যস্তর কমিয়ে সুনির্দিষ্ট কর পদ্ধতি চালু এবং সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম বাড়ানো গেলে শুধু সিগারেট খাত থেকেই প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব অর্জন সম্ভব। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে প্রায় চার লাখ অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা যেতে পারে।
রোববার (১০ মে) রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব-এর জহুর হোসেন চৌধুরী হলে ‘বাজেট ২০২৬-২৭: জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন ও তামাক রাজস্ব বৃদ্ধি’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স (আত্মা) যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।
আলোচনা সভায় সিগারেটের নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার খুচরা মূল্য ১০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়া হয়। এছাড়া উচ্চ স্তরে ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরে ২০০ টাকা বা তার বেশি মূল্য নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। একইসঙ্গে বিদ্যমান ৬৭ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বহাল রেখে প্রতি ১০ শলাকার প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেন বক্তারা।
এ প্রস্তাবের পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্রাটেজিক স্টাডিজ-এর রিসার্চ ডিরেক্টর ড. মাহফুজ কবীর বলেন, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সিগারেটের দামের পার্থক্য খুবই কম এবং প্রায় ৯০ শতাংশ ভোক্তা এ দুই স্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ফলে স্তর দুটি একীভূত করে দাম বাড়ানো গেলে তরুণ ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীর মধ্যে সিগারেট ব্যবহার নিরুৎসাহিত হবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক বলেন, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তুলনায় তামাকপণ্য এখনও সস্তা, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। কার্যকর করনীতির মাধ্যমে তামাকপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে নিতে হবে।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, কর আদায় সহজ ও কার্যকর করতে সুনির্দিষ্ট কর পদ্ধতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
Channel 24-এর নির্বাহী পরিচালক জহিরুল আলম বলেন, তামাকপণ্যের ক্ষতি ও কর বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে গণমাধ্যমে আরও বেশি প্রতিবেদন প্রকাশ করা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেনিন চৌধুরী আসন্ন বাজেটে তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রস্তাব বাস্তবায়নের আহ্বান জানান। আর পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-এর প্রেসিডেন্ট ইলেক্ট ডা. আবু জামিল ফয়সাল বলেন, তামাকমুক্ত প্রজন্ম গড়তে সব ধরনের তামাকপণ্যের দাম ও কর বাড়ানোর বিকল্প নেই।
সভায় বিড়ি, জর্দা ও গুলের ক্ষেত্রেও কর ও মূল্য সমন্বয়ের প্রস্তাব দেয়া হয়। ২০ শলাকা ফিল্টারযুক্ত ও ফিল্টারবিহীন বিড়ির অভিন্ন মূল্য ৩০ টাকা নির্ধারণ এবং ৫০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি জর্দা ও গুলের ক্ষেত্রে যথাক্রমে প্রতি ১০ গ্রামে ৬০ টাকা ও ৩০ টাকা মূল্য নির্ধারণ করে ৬০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেয়া হয়। সব ধরনের তামাকপণ্যের ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ১ শতাংশ স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জ বহাল রাখার কথাও উল্লেখ করা হয়।
বক্তারা জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাক ব্যবহার করেন এবং তামাকজনিত রোগে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া সিগারেটের দাম দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের তুলনায় কম। এ কারণে তামাকপণ্যের সহজলভ্যতা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
সবার দেশ/কেএম




























