তামাক-নিকোটিনমুক্ত হোক তরুণদের ফুসফুস
আজ বিশ্ব ফুসফুস দিবস ২০২৬
আজ ২৫ সেপ্টেম্বর বিশ্ব ফুসফুস দিবস ২০২৬। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘এ লাইফটাইম অব লাং হেলথ’। ফুসফুসের সুস্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং শ্বাসতন্ত্রের রোগ প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতেই প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়। আন্তর্জাতিক শ্বাসতন্ত্রবিষয়ক সংগঠনগুলোর জোটের উদ্যোগে পালিত এ দিবসের এবারের মূল বার্তা হলো—শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্ব দেয়া।
বিশ্বজুড়ে অকালমৃত্যু ও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার অন্যতম বড় কারণ শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ। ফুসফুসের ক্যানসার, ক্রনিক অবস্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ বা সিওপিডি, অ্যাজমা, যক্ষ্মাসহ নানা রোগ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করে। ধূমপান ও তামাকজাত পণ্যের ব্যবহার এসব রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তামাক শরীরের প্রায় সব অঙ্গের ক্ষতি করে এবং প্রতি বছর বিশ্বে ৭০ লাখের বেশি মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে তামাকের ব্যবহার জড়িত। এর মধ্যে ১৬ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি ধূমপান না করেও পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে এসে মারা যান।
বাংলাদেশেও ফুসফুস ও শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগের বোঝা উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বাংলাদেশ স্যাম্পল ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস ২০২৩ প্রতিবেদনটি ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয়েছে এবং দেশের মৃত্যুর কারণসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এতে উঠে এসেছে।
দেশে তামাক ব্যবহারের ব্যাপকতাও ফুসফুসের স্বাস্থ্যের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় দুই লাখ মানুষ তামাক ব্যবহারজনিত বিভিন্ন রোগে মারা যায় এবং প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ তামাক ব্যবহার করে। ধূমপানের পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শও ফুসফুসের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। ফলে একজন ধূমপায়ীর পাশাপাশি তার পরিবারের সদস্য, সহকর্মী ও আশপাশের মানুষও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
এদিকে প্রচলিত তামাকপণ্যের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে নতুন ধরনের নিকোটিন পণ্যের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ই-সিগারেট, ভেপিং, হিটেড টোব্যাকো প্রডাক্ট ও নিকোটিন পাউচের মতো পণ্য তরুণদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলতে বিভিন্ন ধরনের বিপণন কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিকোটিন অত্যন্ত আসক্তিকর এবং শিশু, কিশোর ও তরুণদের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর।
বিশ্ব ফুসফুস দিবস ২০২৬ উপলক্ষে গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)-এর নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন,
ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রচলিত তামাকপণ্যসহ ই-সিগারেট, ভেপিং এবং অন্যান্য নিকোটিন পণ্যের ব্যবহার ও বিস্তার রোধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
বিশ্ব ফুসফুস দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যে ফুসফুসের স্বাস্থ্যকে শুধু নির্দিষ্ট বয়সের বিষয় হিসেবে না দেখে পুরো জীবনচক্রের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্বাসতন্ত্রবিষয়ক সংগঠনগুলোর জোটের প্রচারণায় শিশুদের সুস্থ ফুসফুসের বিকাশ, কৈশোর ও যৌবনে ফুসফুসের সুস্থ বৃদ্ধি, প্রাপ্তবয়স্কদের ফুসফুসের স্বাস্থ্য বজায় রাখা এবং আজীবন সুস্থ ফুসফুস নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ ও জনস্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, ফুসফুসের রোগ প্রতিরোধে ধূমপান ও তামাক বর্জনের পাশাপাশি পরোক্ষ ধূমপান থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেয়া, বায়ুদূষণ কমানো, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসার আওতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে কিশোর ও তরুণদের নিকোটিনে আসক্তি থেকে সুরক্ষায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।
বিশ্ব ফুসফুস দিবস তাই শুধু একটি দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ফুসফুসের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। তামাক ও নিকোটিনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নতুন প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখা গেলে দীর্ঘমেয়াদে শ্বাসতন্ত্রের রোগের ঝুঁকি কমানোর পাশাপাশি একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলার পথও সুগম হবে।
সবার দেশ/কেএম




























