গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, সংসদে ৩ বিল
গুমকে স্বতন্ত্র ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ উত্থাপন করা হয়েছে। একই দিনে ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন প্রণয়ন এবং ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধনের জন্য আরও দুটি বিল সংসদে তোলা হয়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সংসদে আলাদাভাবে বিল তিনটি উত্থাপন করা হয়। পরে সেগুলো পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে। তবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপনের সময় বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন।
এর আগে বেসরকারি সদস্যদের সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিষ্পত্তির পর আইন প্রণয়ন কার্যক্রম শুরুর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি জুলাই সনদ, সংবিধান সংস্কার পরিষদ এবং সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত বিশেষ কমিটি নিয়ে সমালোচনা করেন।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না হওয়ার বিষয়েও কঠোর আপত্তি জানান তিনি। পরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল উত্থাপনের কার্যক্রমে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়ে বিরোধীদলীয় সদস্যদের নিয়ে রাত ৮টা ৬ মিনিটে ওয়াকআউট করেন।
গুমের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড
‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে বিলটি পরীক্ষা করে সংসদে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
বিলে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করাই এ আইনের অন্যতম লক্ষ্য।
প্রস্তাবিত আইনে বলা হয়েছে, কোনও সরকারি কর্মচারী বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য নিজ পরিচয়ে কিংবা সরকারের সমর্থনে কাউকে গ্রেফতার, আটক বা অপহরণ করে তার স্বাধীনতা হরণ করার বিষয়টি অস্বীকার করলে বা তার অবস্থান গোপন রাখলে সেটি গুম হিসেবে বিবেচিত হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আওতায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা, র্যাব ও যেকোনো যৌথ বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিলে বলা হয়েছে, গুমের ফলে কোনও ব্যক্তির মৃত্যু হলে, লাশ উদ্ধার হলে অথবা পাঁচ বছর পার হওয়ার পরও তাকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে দায়ী ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। এর সঙ্গে সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে।
তদন্ত ও বিচারেও বিশেষ বিধান
প্রস্তাবিত আইনে গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারে আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার এবং ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে।
ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকারও স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণের জন্য তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে। দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য গুম সনদ দেয়ার বিধানও রয়েছে।
এ ছাড়া গুমের ঘটনাগুলোর তথ্য সংরক্ষণে কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার এবং এ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিধান রাখা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে গুমের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বিধান রয়েছে। বিচারকাজও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার কথা বলা হয়েছে। গুমের মিথ্যা অভিযোগ করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অভিযুক্ত বাহিনী তদন্ত করতে পারবে না
বিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনও সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে দিয়ে সে অভিযোগ তদন্ত না করার বিধান রাখা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কোনও পক্ষের আবেদনের ভিত্তিতে অথবা স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকার অভিযুক্ত বাহিনী ছাড়া অন্য কোনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা আন্তবাহিনী তদন্ত দলের কাছে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবে।
গুমের অপরাধের বিচার করবেন এখতিয়ারসম্পন্ন দায়রা জজ আদালত। অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার শেষ করার কথা বলা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে বিচার শেষ করা সম্ভব না হলে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে আরও ৩০ কার্যদিবস সময় নেয়া যাবে।
তবে কোনও অভিযোগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে বিচারযোগ্য বলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে প্রতীয়মান হলে তদন্ত প্রতিবেদন ও সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের নতুন আইন
২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন আইন প্রণয়নের জন্য সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। পরে বিলটি পরীক্ষা করে দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
প্রস্তাবিত আইনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য সুপারিশ দিতে একটি বাছাই কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে।
এ কমিটিতে স্পিকার, আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি ও বিরোধী দল মনোনীত দুজন সংসদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ইউজিসি মনোনীত একজন অধ্যাপক, রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন নাগরিক প্রতিনিধি এবং নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন প্রতিনিধি রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রেও কমিশনের ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কমিশন নিজ উদ্যোগে বা আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে।
প্রতিবেদনে কমিশন সন্তুষ্ট হলে পরবর্তী পদক্ষেপ না নেয়ার সুযোগ থাকবে। সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ করতে পারবে। কমিশনের সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানকে তাদের নেয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে লিখিতভাবে জানাতে হবে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনেও সংশোধন
১৮৮২ সালের দ্য ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট সংশোধনের জন্য তৃতীয় বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। পরে বিলটি পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহ তার সন্তান বা নাতি-নাতনিকে, অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পর দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করার সুযোগ রাখার কথা বলা হয়েছে।
দাতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির গ্রহীতা মারা গেলে ওই সম্পত্তির ভোগাধিকার বজায় থাকবে এবং আইন অনুযায়ী তা গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে স্থানান্তরিত হবে বলে বিলে প্রস্তাব করা হয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























