অস্বীকার প্রতিমন্ত্রীর; বদলিকে ‘রুটিন’ বলছে প্রশাসন
পিয়ন নিয়োগে নুরের বিরুদ্ধে তদবিরের অভিযোগ, ডিসিকে বদলি
পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অফিস সহায়ক (পিয়ন) নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এবং জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীর মধ্যে বিরোধের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিমন্ত্রীর কথিত তদবির উপেক্ষা করে প্রক্সি পরীক্ষায় অংশ নেয়া এক চাকরিপ্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জেরেই জেলা প্রশাসককে বদলি করা হয়েছে—এমন দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্র।
তবে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর এ অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, পিয়ন নিয়োগ নিয়ে কোনও তদবির তিনি করেননি; বরং জেলা প্রশাসকের আচরণগত সমস্যার বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। অন্যদিকে বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেছেন, জেলা প্রশাসকের বদলি প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, বিসিএস ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীকে সম্প্রতি যুগ্ম সচিব হিসেবে পদোন্নতির পর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়েছে। তিনি ২০২৫ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন।
কী ঘটেছিলো নিয়োগ পরীক্ষায়
পটুয়াখালী জেলা রাজস্ব প্রশাসনে অফিস সহায়কের ১০টি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য গত ২৫ সেপ্টেম্বর লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরদিন উত্তীর্ণ প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়।
ভাইভা বোর্ডে জহিরুল ইসলাম নামে এক প্রার্থীকে নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লিখিত পরীক্ষায় তিনি সর্বোচ্চ নম্বর পেলেও মৌখিক পরীক্ষায় বোর্ডের সদস্যদের করা সাধারণ প্রশ্নেরও যথাযথ উত্তর দিতে পারছিলেন না। পরে লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্রের হাতের লেখার সঙ্গে তার হাতের লেখা মিলিয়ে দেখলে অসঙ্গতি পাওয়া যায় বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে জহিরুল প্রক্সি পরীক্ষার বিষয়টি স্বীকার করেন বলে মামলার নথির বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ২৫ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালী সরকারি কলেজের বাণিজ্য ভবনে অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষায় তার পরিবর্তে ‘সাখাওয়াত’ নামে অন্য একজন অংশ নেন।
ঘটনাটি জানাজানি হলে ভাইভা বোর্ড পুলিশকে খবর দেয়। পরে জহিরুলকে আটক করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও প্রক্সি পরীক্ষার অভিযোগে তাকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
এরপরই ওঠে তদবিরের অভিযোগ
প্রক্সি পরীক্ষায় ধরা পড়া ওই প্রার্থীকে ঘিরে পরবর্তী সময়ে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের তদবিরের অভিযোগ সামনে আসে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মচারীর বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জহিরুল ছিলেন প্রতিমন্ত্রীর পছন্দের প্রার্থী এবং তাকে নিয়োগ দিতে জেলা প্রশাসকের কাছে তদবির করা হয়েছিলো।
তবে এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন নুরুল হক নুর।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, জেলা প্রশাসকের বদলির সঙ্গে পিয়ন নিয়োগের কোনও সম্পর্ক নেই। তার অভিযোগ, জেলা প্রশাসক তার সঙ্গে যথাযথ আচরণ করতেন না এবং সিনিয়র জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাকে যথাযথ সম্মান দেখাতেন না।
নুর বলেন, তিনি পটুয়াখালীতে গেলে জেলা প্রশাসক তার অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন না। এমনকি একটি সরকারি সফরের সময় জেলা প্রশাসক একটি সেমিনারে অংশ নেয়ার কথা বলে কুয়াকাটায় চলে গিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি। এসব আচরণের বিষয় তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
প্রশাসনের ব্যাখ্যা কী
জেলা প্রশাসকের বদলি নিয়ে বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার খলিল আহমেদ বলেন, ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীর পদোন্নতি হয়েছে এবং তার বদলি প্রশাসনের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। এ বদলির সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের কোনও সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা তার জানা নেই বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে বদলির বিষয়ে জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ শহীদ হোসেন চৌধুরীর বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনও মন্তব্য করতে চাননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আগেও ডিসিকে নিয়ে নুরের অভিযোগ
পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসনকে ঘিরে নুরুল হক নুরের অসন্তোষের বিষয়টি অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালের জুনে তৎকালীন পটুয়াখালীর ডিসিকে নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনা করেছিলেন নুর। সে সময় তিনি জেলা প্রশাসকের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ তুলে তাকে পটুয়াখালী থেকে সরানোর দাবি জানিয়েছিলেন।
তবে বর্তমান ঘটনার সঙ্গে আগের বিরোধের সরাসরি যোগসূত্র আছে কি না, তা আলাদাভাবে প্রমাণিত হয়নি।
প্রশ্ন তুলেছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক
পটুয়াখালীর ডিসি বদলির ঘটনাকে ঘিরে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ—টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তার বক্তব্য, একই সময়ে একাধিক জেলা প্রশাসক বদলি হওয়ায় ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে প্রশাসনিক রদবদলের অংশ বলেই মনে হতে পারে। কিন্তু পটুয়াখালীর ডিসির ক্ষেত্রে একজন জনপ্রতিনিধির পক্ষ থেকে অনৈতিক চাপ দেয়ার অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, প্রক্সি পরীক্ষার মতো প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত কোনও প্রার্থীর পক্ষে জনপ্রতিনিধির চাকরির সুপারিশ করা হলে সেটি নৈতিকতার প্রশ্ন তৈরি করে। আর ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার কারণে কোনও সরকারি কর্মকর্তাকে স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার বাইরে শাস্তিমূলকভাবে বদলি করা হয়ে থাকলে সেটিও গুরুতর প্রশাসনিক প্রশ্ন তৈরি করবে।
সূত্র: আমার দেশ
সবার দেশ/এমকেজে




























