রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘জয়ের হিসাব’ নয়
অলি আহমদকে প্রার্থী করে জামায়াতের বড় রাজনৈতিক বার্তা
প্রায় তিন দশক পর আবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি ভোটের লড়াই হতে যাচ্ছে। সংখ্যার হিসাবে বিএনপির প্রার্থীই যে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন, তা অনেকটাই নিশ্চিত। জাতীয় সংসদে দলটির দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন থাকায় বিরোধী প্রার্থীর পক্ষে জয় পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তবু সেই অসম লড়াইয়ে বিএনপিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী দিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, বিএনপির একসময়ের ঘনিষ্ঠ নেতা, জিয়াউর রহমানের সহচর এবং মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বের জন্য বীরবিক্রম খেতাব পাওয়া লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে বেছে নিয়েছে জোটটি।
রোববার (৯ আগস্ট) রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১-দলীয় ঐক্যের বৈঠক থেকে অলি আহমদের নাম রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। জামায়াতের পাশাপাশি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), এলডিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল এ জোটের অংশ।
সংখ্যার হিসাবে বিএনপির সঙ্গে এ লড়াই একতরফা হলেও ১১-দলীয় জোটের নেতাদের ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী দেওয়ার লক্ষ্য শুধু জয় নয়। এর পেছনে রয়েছে জোটের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরা, সংসদীয় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সক্রিয় থাকা এবং ভবিষ্যতের রাজনীতিতে নিজেদের শক্ত অবস্থান জানান দেয়ার হিসাব।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। বর্তমান সংসদে বিএনপির রয়েছে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। বিপরীতে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের সংসদ সদস্য সংখ্যা ৭৮। ফলে বিএনপির প্রার্থীর জয় প্রায় নিশ্চিত জেনেও অলি আহমদকে প্রার্থী করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সর্বশেষ সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছিল ১৯৯১ সালে। ওই নির্বাচনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির প্রার্থী আবদুর রহমান বিশ্বাস জয়ী হন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটের প্রয়োজন হয়নি। এবার অলি আহমদ প্রার্থী হওয়ায় প্রায় ৩৫ বছর পর আবারও রাষ্ট্রপতি পদে ভোটের লড়াইয়ের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
জামায়াতের ‘অলি কার্ড’
১১-দলীয় জোটের একাধিক সূত্রের ভাষ্য, অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার বিষয়ে জামায়াতের আগ্রহই ছিলো বেশি। অলি আহমদও প্রার্থী হতে সম্মতি দিয়েছেন। এনসিপিসহ জোটের অন্য দলগুলো তার প্রার্থিতায় বড় ধরনের আপত্তি তোলেনি।
অলি আহমদকে সামনে আনার পেছনে জামায়াতের রাজনৈতিক হিসাবও রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক বিতর্ক ও সমালোচনা রয়েছে। অন্যদিকে অলি আহমদ একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং বীরবিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত সাবেক সামরিক কর্মকর্তা।
এই বৈপরীত্যকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ দেখছে জামায়াত। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সামনে রেখে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সমালোচনার জবাব দেওয়ার একটি সুযোগ হিসেবেও অলি আহমদকে ব্যবহার করতে চাইছে দলটি—এমন আলোচনা রয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
জাতীয় নির্বাচনের আগেও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিভিন্ন বক্তব্যে অলি আহমদের মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকা সামনে এনেছিলেন।
গত ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের বন্দর এলাকায় ১১-দলীয় ঐক্যের নির্বাচনী সমাবেশে জামায়াত আমির বলেছিলেন, ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম থেকেই স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হয়েছিলো। সেখানে তিনি অলি আহমদকে ‘গর্বিত সন্তান’ হিসেবে উল্লেখ করে তার মুক্তিযুদ্ধের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
ওই বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল বিএনপি। পরদিন কক্সবাজারে এক নির্বাচনী পথসভায় বিএনপি নেতা ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জামায়াতের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ তোলেন।
এরপর থেকেই অলি আহমদকে ঘিরে বিএনপি ও জামায়াতের রাজনৈতিক বাগযুদ্ধ আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
পুরোনো প্রতিশ্রুতির হিসাব
জামায়াত ও এনসিপির একাধিক সূত্রের দাবি, জাতীয় নির্বাচনের আগে ১১-দলীয় ঐক্য সরকার গঠন করতে পারলে অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি করার বিষয়ে এলডিপির পক্ষ থেকে আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছিলো। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও গ্রহণযোগ্যতার কথা বিবেচনায় নিয়ে জামায়াতও তখন বিষয়টিতে ইতিবাচক ছিলো।
নির্বাচনের ফলাফলে ১১-দলীয় জোট সরকার গঠন করতে না পারলেও অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করে সে পুরোনো প্রতিশ্রুতির একটি রাজনৈতিক বাস্তবায়ন করতে চাইছে জামায়াত—এমন ব্যাখ্যাও রয়েছে জোটের ভেতরে।
একই সঙ্গে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের বাইরে বিরোধী জোটও যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে, সেটি দেখানোও এই প্রার্থিতার অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিএনপির ঘনিষ্ঠ থেকে বিরোধী শিবিরে
অলি আহমদ একসময় বিএনপির রাজনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন জেড ফোর্সের অধীনে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কর্মকর্তা হিসেবে যুদ্ধে অংশ নেন তিনি। বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য পান বীরবিক্রম খেতাব।
জিয়াউর রহমানের আহ্বানে ১৯৮০ সালে সেনাবাহিনীর চাকরি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেন অলি আহমদ। ওই বছরই উপনির্বাচনে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নে সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
১৯৯৬ সালের দুটি সংসদ নির্বাচনেই বিএনপির সংসদ সদস্য হন অলি। ওই বছরের প্রথম নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপির স্বল্পস্থায়ী সরকারে তিনি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য হলেও বিএনপির সরকারে তিনি মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি। পরে বিএনপির সঙ্গে তার দূরত্ব বাড়তে থাকে।
২০০৬ সালের অক্টোবরে বিএনপি ছাড়েন তৎকালীন স্থায়ী কমিটির সদস্য অলি আহমদ। তার সঙ্গে দলের আরও কয়েকজন নেতা বেরিয়ে আসেন। পরে গঠন করেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির সাবেক মহাসচিব এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীও একপর্যায়ে তার সঙ্গে যুক্ত হন। তবে পরবর্তীতে দুজনের রাজনৈতিক পথ আলাদা হয়ে যায়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে এককভাবে ‘ছাতা’ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে পরাজিত করে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন অলি আহমদ। পরে ২০১২ সালে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত ২০-দলীয় জোটে যোগ দেন তিনি।
২০১৮ সালের নির্বাচনেও এলডিপির হয়ে ‘ছাতা’ প্রতীকে নির্বাচন করেন। তবে ওই আসনে বিএনপিরও প্রার্থী ছিলো। ২০২২ সালের শেষ দিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট ভেঙে যাওয়ার পরও সরকারবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বিএনপির সঙ্গে ছিলেন অলি আহমদ।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির কাছ থেকে ১৪টি আসন চেয়ে সাড়া না পেয়ে নির্বাচনের প্রায় দেড় মাস আগে এককভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দেন তিনি। পরে ২৮ ডিসেম্বর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত জানান।
বিএনপির সঙ্গে পুরোনো বিরোধের নতুন অধ্যায়
রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট গঠন নিয়েও অলি আহমদের আপত্তি ছিলো। দলীয় ফোরামে তিনি বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান জানিয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট বিপুল জয় পেলেও অলি আহমদ মন্ত্রিসভায় স্থান পাননি। অন্যদিকে জামায়াতের তৎকালীন দুই শীর্ষ নেতা মন্ত্রিসভায় জায়গা পান।
অলির অনুসারীদের একটি অংশ তখন মনে করতো, বিএনপি-জামায়াত জোটের ভেতরে তার অবস্থানের বিরোধিতার কারণেই তিনি মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি।
দীর্ঘ রাজনৈতিক পথপরিক্রমায় বিএনপির সঙ্গে অলি আহমদের সম্পর্ক কখনও ঘনিষ্ঠ, কখনো দূরত্বপূর্ণ ছিলো। কখনও মিত্র হিসেবে বিএনপির পাশে থেকেছেন, আবার কখওে দলটির বিরোধী অবস্থানে গেছেন। এবার রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সেই রাজনৈতিক সম্পর্কের আরেকটি নতুন অধ্যায় তৈরি হলো।
অলির সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যও এ ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। গত ২৫ জুলাই সিলেটে এক সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান, এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক এক হয়ে গেলে এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে উঠবে।
এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে অলি আহমদ যে বর্তমান বিরোধী জোটের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছেন, তা স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
জয় নয়, ভবিষ্যতের রাজনীতির হিসাব
১১-দলীয় জোটের নেতাদের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অলি আহমদের প্রার্থিতা মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।
একদিকে বিএনপির বিপুল সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিরোধী জোট নিজেদের সাংবিধানিক ও সংসদীয় রাজনীতির সক্রিয় অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে। অন্যদিকে একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে সামনে রেখে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও বিস্তৃত পরিসরে উপস্থাপনের সুযোগও নিচ্ছে জামায়াত।
সবচেয়ে বড় বিষয়, বিএনপির একসময়ের ঘরের লোক অলি আহমদকে এবার বিএনপির বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল প্রায় নিশ্চিত হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ফলাফলের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
সংখ্যার হিসাবে বিএনপির জয় নিশ্চিত—কিন্তু ভোটের মাঠে অলি আহমদের উপস্থিতি বিরোধী জোটের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণ, বিএনপির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং সংসদীয় রাজনীতিতে তাদের কৌশল কোন পথে যাবে, সে প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
সবার দেশ/কেএম




























