১১ হাজার কোটি ফিরলেই গ্যাস-বিদ্যুৎ হাসবে!
টাকা কোথায়, তা নিয়ে প্রশ্ন; কিন্তু টাকা ফিরিয়ে কী করতে হবে—সে পরামর্শ প্রস্তুত। অভিযোগের টাকা ফেরত এলে বিদ্যুৎ জ্বলবে—নাকি আগে টাকারই সন্ধান মিলবে? ‘১১ হাজার কোটি’ ফিরিয়ে এনে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের দাবি জানালেন আসিফ।
দেশে গ্যাস নেই। বিদ্যুৎ আছে, তবে মাঝে মাঝে এমনভাবে থাকে যে তাকে ‘আছে’ বলাটাও এক ধরনের আশাবাদ। চুলায় আগুন নেই, বিদ্যুতের লাইনে ভোল্টেজ নেই—কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে রাজনৈতিক বক্তব্যে শক্তির কোনও ঘাটতি নেই!
এরই মধ্যে আলোচনায় এসেছে ১১ হাজার কোটি টাকা। অভিযোগ—এই বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হয়েছে। আর সে টাকা দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে ব্যবহারের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।
মঙ্গলবার রাতে ফেসবুকে তিনি লিখেছেন,
১১ হাজার কোটি টাকা দ্রুত ফিরিয়ে এনে গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের জোর দাবি জানাচ্ছি।
বাহ! সংকটের সমাধান তো তাহলে পাওয়া গেলো!
গ্যাস নেই—১১ হাজার কোটি আনুন।
বিদ্যুৎ নেই—১১ হাজার কোটি আনুন।
ডলার সংকট—১১ হাজার কোটি আনুন।
অর্থনীতি চাপে—আবারও ১১ হাজার কোটি আনুন।
শুধু একটা সমস্যা—১১ হাজার কোটি টাকাটা আগে খুঁজে বের করতে হবে!
টাকা আছে, নাকি নেই—এটাই আসল বিদ্যুৎ সংকট
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ পাওয়ার কথা। অভিযোগটি তার বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি।
অন্যদিকে আসিফ মাহমুদ অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, দেশের বাইরে তার কোনও সম্পদ নেই। এমনকি বিদেশে তার কোনও সম্পদ থাকার প্রমাণ দিতে পারলে রাজনীতি ছেড়ে দেয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
এখন জনগণের অবস্থা অনেকটা বিদ্যুৎ অফিসের গ্রাহকের মতো—সবাই জানতে চাইছে, ‘বিদ্যুৎ আসবে কবে?’
আর এখানে প্রশ্নটা একটু অন্য রকম—
‘১১ হাজার কোটি আসলে আছে কোথায়?’
দুদক বলছে অভিযোগ আছে।
আসিফ মাহমুদ বলছেন অভিযোগ সত্য নয়।
আর ফেসবুক বলছে—আলোচনা আছে!
টাকার আগে পরিকল্পনা, নাকি পরিকল্পনার আগে টাকা?
দেশে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট অবশ্যই কোনও রসিকতার বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন।
কিন্তু ১১ হাজার কোটি টাকা দেশে এলেই যে পরদিন সকাল থেকে গ্যাসের চুলায় আগুন জ্বলবে এবং বিদ্যুতের মিটারে সুখের ঘণ্টা বাজবে—এমন সরল সমীকরণ অর্থনীতির বইয়ে আছে কি না, সেটি অর্থনীতিবিদরাই ভালো বলতে পারবেন।
কারণ টাকা দেশে ফেরানো এক বিষয়, আর সেই টাকা দিয়ে জ্বালানি সংকটের কাঠামোগত সমাধান করা আরেক বিষয়।
তার ওপর টাকাটি সত্যিই বিদেশে পাচার হয়েছে কি না, হলে কার মাধ্যমে হয়েছে, কোথায় আছে, কীভাবে ফেরত আসবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও আগে দরকার।
অর্থাৎ গ্যাসের আগে এখন গণিতের চাপ!
১১ হাজার কোটি টাকারও যদি ‘লোডশেডিং’ হয়?
ভাবুন তো, একদিন খবর এলো—
‘১১ হাজার কোটি টাকা পাওয়া গেছে!’
দেশবাসী আনন্দে আত্মহারা।
পরদিন আরেক খবর—
‘টাকা ফেরত আনার প্রক্রিয়া চলছে।’
তৃতীয় দিন—
‘আইনি জটিলতায় টাকা আটকে আছে।’
চতুর্থ দিন—
‘আলোচনা চলছে।’
পঞ্চম দিন—
‘কমিটি গঠন।’
ষষ্ঠ দিন—
‘কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনায় উপকমিটি।’
তারপর?
দেশের মানুষ আবার মোমবাতি হাতে বসে আছে।
তখন হয়তো প্রশ্ন উঠবে—বিদ্যুতের লোডশেডিং তো বুঝলাম, ১১ হাজার কোটি টাকারও কি লোডশেডিং শুরু হলো?
ফেসবুকে প্রতিক্রিয়া, বাস্তবে অপেক্ষা
আসিফ মাহমুদের পোস্টে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার রিয়্যাকশন পড়েছে। অর্থাৎ বক্তব্যটি সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ আলোড়ন তুলেছে।
তবে ফেসবুকের রিয়্যাকশন দিয়ে গ্যাসের চাপ বাড়ে না, বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ে না। তার জন্য দরকার জ্বালানি, অবকাঠামো, অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা—আর সবচেয়ে বেশি দরকার বাস্তব পদক্ষেপ।
তবু ১১ হাজার কোটি টাকার গল্পটির একটি চমৎকার দিক আছে।
এটি আমাদের সামনে একসঙ্গে তিনটি প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে—
টাকা কি সত্যিই পাচার হয়েছে?
টাকা কোথায়?
আর টাকা থাকলে সেটি ফেরত এনে কীভাবে ব্যবহার করা হবে?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেবেন তদন্তকারীরা, দ্বিতীয়টির উত্তর খুঁজবে আইনশৃঙ্খলা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, আর তৃতীয়টির উত্তর দিতে হবে নীতিনির্ধারকদের।
শেষ কথা: আগে টাকা, না আগে প্রমাণ?
রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি দেয়া সহজ। ফেসবুকে দাবি জানানো আরও সহজ। কিন্তু ১১ হাজার কোটি টাকা খুঁজে বের করা, আইনি প্রক্রিয়ায় তা দেশে ফেরানো এবং জনগণের স্বার্থে সঠিকভাবে ব্যয় করা—এ তিনটি কাজ একেবারেই ভিন্ন ব্যাপার।
তাই আপাতত গ্যাসের চুলায় হাঁড়ি বসানোর আগে একটু অপেক্ষা করাই ভালো।
কারণ,
১১ হাজার কোটি টাকার হাঁড়ি চড়েছে ঠিকই, কিন্তু টাকা এখনও হাঁড়িতে পড়েনি!
আর টাকা আদৌ আছে কি না—সেটিও এখনো তদন্তের বিষয়।
তবে যদি সত্যিই থাকে এবং সত্যিই ফেরত আসে, তাহলে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি দেশের মানুষ হয়তো আরেকটি জিনিসেরও অপেক্ষা করবে—
এতোদিন টাকা বিদেশে গেলো কীভাবে, আর এত টাকা গেলেও কেউ দেখলো না কেনো?
এ প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া গেলে হয়তো বিদ্যুৎ না থাকলেও অন্তত ‘বুদ্ধির আলোটা’ জ্বলবে।
সবার দেশ/এমকেজে




























