অবশেষে পদত্যাগ করলেন ট্রাইব্যুনাল থেকে
কোটি টাকা ঘুষ চাইলেন প্রসিকিউটর সাইমুম, অডিও ফাঁস
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে নিহত কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলায় সাবেক এক সাবেক সংসদ সদস্যকে খালাস পাইয়ে দেয়ার আশ্বাসে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ ওঠার পরই তিনি পদত্যাগ করেছেন এবং সরকার তার পদত্যাগ গ্রহণ করে তাকে অব্যাহতি দিয়েছে।
সোমবার (৯ মার্চ) তার পদত্যাগের খবর প্রকাশের পর ঘুষ দাবির কথিত দুটি অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়। পরে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে ওই অডিও সম্প্রচার করা হয়। অডিওগুলোতে চট্টগ্রামের রাউজান আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের এক আইনজীবীর সঙ্গে কথোপকথনের অংশ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
ফাঁস হওয়া কথোপকথনে আর্থিক লেনদেন নিয়ে দরকষাকষির পাশাপাশি মামলার বিষয়ে তদবির এবং ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া সম্পর্কেও আলোচনা শোনা যায়। সেখানে এক কোটি টাকা চাওয়ার পাশাপাশি ১০ লাখ টাকা অগ্রিম দেয়ার কথাও বলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অডিওতে আরও বলা হয়, মামলায় অব্যাহতি নিশ্চিত করতে বিএনপির এক সংসদ সদস্য ও একজন প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে তদবির করানো যেতে পারে। সে সঙ্গে ট্রাইব্যুনালের নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে ‘রিজনেবল’ বলে উল্লেখ করে তার সমর্থন আদায়ের বিষয়েও কথা শোনা যায়।
এ বিষয়ে সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবী রেজওয়ানা ইউসুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি কোনও মন্তব্য করতে চাননি। তবে অডিওটি বাস্তবসম্মত কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এত বড় ঘটনার ক্ষেত্রে কোনও না কোনও সত্য থাকার সম্ভাবনা থাকতে পারে।
অন্যদিকে সাইমুম রেজা তালুকদার তার বিরুদ্ধে ওঠা ঘুষ দাবির অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছেন। মঙ্গলবার রাত ৯টা ৫ মিনিটে ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, এটি একটি মহলের অপপ্রচার এবং ফাঁস হওয়া অডিওগুলো মিথ্যা।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪–এর একটি মামলায় একজন আসামিকে খালাস পাইয়ে দেয়ার বিনিময়ে তিনি এক কোটি টাকা দাবি করেছেন—এমন অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, এমন কোনও ঘটনা কখনও ঘটেনি এবং তিনি কারও কাছ থেকে কোনও ধরনের অর্থ দাবি করেননি।
সাইমুম রেজা আরও ব্যাখ্যা করেন, একটি মামলা একাধিক প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে গঠিত একটি টিম পরিচালনা করে। তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এবং চিফ প্রসিকিউটরের নেতৃত্বে কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে মামলার নথি প্রস্তুত করা হয়। পরে আদালতে উভয় পক্ষের শুনানি, সাক্ষ্য ও যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে বিচারকরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত দেন। তাই একজন প্রসিকিউটরের পক্ষে কোনও আসামিকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেয়া সম্ভব নয় বলেও তিনি দাবি করেন।
পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি জানান, অনেক দিন ধরেই তিনি তার আগের কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন। গবেষণা ও লেখালেখিতে মনোযোগ দেয়া এবং পরিবারের সঙ্গে বেশি সময় কাটানোর উদ্দেশ্যেই তিনি দায়িত্ব ছেড়েছেন বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে ফাঁস হওয়া অডিওর সত্যতা নিয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক তদন্ত হয়নি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর ও সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, অডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কি না তা এখনও পরীক্ষা করা হয়নি। তবে কথোপকথনের শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরণ ও বাচনভঙ্গি বিশ্লেষণ করলে এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে।
তিনি জানান, বিষয়টি নিশ্চিত হতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভয়েস স্যাম্পল, আইপিডিআর ও সিডিআর বিশ্লেষণসহ পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত প্রয়োজন। সে তদন্তের মাধ্যমেই নির্দিষ্টভাবে জানা যাবে কথোপকথনটি কারা করেছেন এবং এর উদ্দেশ্য কী ছিলো।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরামসহ মোট ৯ জন নিহত এবং ৪৫৯ জন আহত হওয়ার ঘটনায় সাবেক সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টা করার সময় তাকে গ্রেফতার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে ঘিরে সংঘটিত গণহত্যার মামলায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
সবার দেশ/কেএম




























