আলজাজিরার প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গে মানবিক সংকটের আশঙ্কা
‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে নথিহীনদের সীমান্তে ঠেলে দিচ্ছে ভারত
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার কথিত নথিবিহীন মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করেছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা। এতে সীমান্তবর্তী এলাকায় উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ১০ কোটি মানুষের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে বিজেপি। এরপর নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কথিত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ‘শনাক্ত, বাদ দেয়া ও নির্বাসন’ নীতি ঘোষণা করেন। সমালোচকদের দাবি, এ অভিযানের মূল লক্ষ্য মুসলিম জনগোষ্ঠী, কারণ ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের আওতায় হিন্দু ও অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ সুবিধা রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়কে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক ব্যক্তিদের সীমান্ত এলাকায় পাঠানো হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় অস্থায়ী আটককেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার ব্যক্তিকে বহিষ্কার বা আটককেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে এবং আরও শত শত মানুষকে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে।
সীমান্তে বাড়ছে মানবিক সংকট
কোলকাতা থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরের হাকিমপুরসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় প্রতিদিন শত শত মানুষের ভিড় জমছে। অস্থায়ী আটককেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত পানি, খাদ্য ও স্বাস্থ্যসেবার অভাব রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রচণ্ড গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার মধ্যে এসব কেন্দ্রে অবস্থানকারীদের মানবেতর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
সাতক্ষীরার বাসিন্দা রাইসুল ইসলাম, যিনি দালালের মাধ্যমে ভারতে গিয়ে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন, আল জাজিরাকে বলেন, পরিবারের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করেই তিনি ভারতে গিয়েছিলেন। কিন্তু স্থানীয়দের হয়রানি ও অপমানের কারণে শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন মিরাজুল গাজী। পাঁচ বছর ধরে ভারতে কাজ করার পর বাড়িওয়ালার চাপ ও স্থানীয়দের শত্রুতার মুখে সবকিছু ফেলে সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নিতে হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-এর ভারতে অবস্থানকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্কে যে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিলো, এ পুশইন ইস্যু সে উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, ৪ জুনের পর থেকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ)-এর অন্তত ১৮টি পুশইনের চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় ১৮০ জনকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছিলো বলে দাবি করা হয়েছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় দিল্লিতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে পুশইন বন্ধের জোর দাবি জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে ভারত সরকারকে ইতোমধ্যে একাধিক কূটনৈতিক চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি জাতীয়তা যাচাইয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও আন্তর্জাতিক আইন অনুসরণের আহ্বান জানান এবং সতর্ক করেন যে এ ধরনের কর্মকাণ্ড দুই দেশের সম্পর্ককে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল দাবি করেছেন, ভারতীয় আইন অনুযায়ী অবৈধ বিদেশিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি জানান, সন্দেহভাজন প্রায় ২ হাজার ৮০০ বাংলাদেশির একটি তালিকা ঢাকার কাছে পাঠানো হয়েছে এবং যাচাই শেষে তাদের ফেরত পাঠানো হবে।
মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভারতের এ পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া পরিচালক এলেইন পিয়ারসন বলেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া কাউকে বহিষ্কার করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী। আটক ব্যক্তিদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে মানবাধিকারকর্মী তিস্তা শীতলবাদ অভিযোগ করেছেন, আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তার মতে, এটি শুধু অভিবাসন ইস্যু নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণের অংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে চলমান এ অভিযান সীমান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























