১১ জন দুই চোখ , ৪৯৩ জন এক চোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়েছেন
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আহত রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনিস্টিটিউট ও হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ১১ জন দুই চোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়েছে। আরও ৪৯৩ জন চিরতরে হারিয়েছেন এক চোখের দৃষ্টি।
আজ সোমবার (২৫ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনিস্টিটিউট ও হাসপাতালের রেটিনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা তার জবানবন্দিতে এ তথ্য দেন। তিনি আন্দোলনের সময় সেখানে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও সাবেক (আইজিপি) আব্দুল্লাহ আল-মামুনের বিরুদ্ধে করা একটি মামলার সাক্ষী তিনি। জবানবন্দিতে জাকিয়া সুলতানা নীলা বলেন, আন্দোলন চলাকালে ১৭ জুলাই থেকে আমাদের হাসপাতালে রোগী আসতে শুরু করে। ঐদিন পাঁচ জন রোগী আসে।১৮ জুলাই ছিল আমাদের জন্য রক্তস্নাত একটি দিন। ঐদিন আমি ওটিতে ব্যস্ত ছিলাম।আমার কাছে খবর আসে হাসপাতালে অনেক আহত রোগী এসেছে, তাদের চিকিৎসা দিতে হবে। সেদিন একশ জনের মতো রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়।এর বাইরে আরও একশ জন রোগী প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।দুপুরের পর আমি জরুরি বিভাগে এসে ভয়াবহ চিত্র দেখতে পাই।সেখানে শতাধিক রোগীকে দেখতে পাই, যাদের বয়স ১৫-২৫ এর মধ্যে। তাদের কেউ একহাত দিয়ে চোখ ধরে আসে, দুই হাত দিয়ে চোখ ধরে আছে কেউ ।তাদের সকলের চেহারা ছিল রক্তস্নাত।ঐদিন দশটি টেবিলে রাত ৯টা পর্যন্ত রোগীদের অস্ত্রপাচার করার কথা জানান তিনি।
ডা. জাকিয়া বলেন, ১৯ জুলাই আমরা প্রায় একই চিত্র দেখতে পাই।ঐদিন রাত দশটা পর্যন্ত আমাদের হাসপাতালে আসা রোগীদের অধিকাংশ মেটালিক পিলেট কেউ কেউ বুলেট দ্বারা আহত ছিল।রোগীদের আহত হওয়ার ধরণ ভয়াবহ ছিল জানিয়ে তিনি বলেন, অধিকাংশ রোগীর চোখের কর্ণিয়া ছিদ্র হয়ে যাওয়া, ক্লোরা (চোখের সাদা অংশ) ছিদ্র হয়ে যাওয়া, চোখ ফেটে যাওয়া, চোখের রেটিনা আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া, চোখের রক্তক্ষরণ। এরপর ৪, ৫, ৬ আগস্ট অসংখ্যা গুরতর আহত রোগীর অস্ত্রপাচার করার কথাও জানান তিনি।
ডা. জাকিয়া সুলতানা নীলা জানান, আহত রোগীদের মধ্যে ৪৯৩ জন একচোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়েছেন। দুই চোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়েছেন ১১ জন। ২৮ জন দুই চোখের গুরুতর দৃষ্টি স্বল্পতায় ভুগছেন।৪৭ জন এক চোখের গুরুতর দৃষ্টি স্বল্পতায় ভুগছেন। ৪৩ জন সাধারণ দৃষ্টি স্বল্পতায় ভুগছেন। তিনি জানান, আহত রোগীদের অনেকই নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের নাম গোপন করে ছদ্মনাম দিয়েছেন, কেউ মোবাইল নাম্বার ভুল নাম্বার দিয়েছেন, কেউ জাতীয় পরিচয়পত্রের ভুল নাম্বার দিয়েছেন।
তিনি শেখ হাসিনাসহ তিন আসামীর বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাদের এই মামলায় আজ ৪ জন সাক্ষী জবানবন্দি দিয়েছেন। তারা হলেন, জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনিস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা.খায়ের আহমেদ চৌধুরী, জুলাই আন্দোলনে শহীদ মারুফ হোসেরন পিতা মো. ইদ্রিস, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত লক্ষীপুর সরকারী কলেজের অর্থনীতি বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী আমেনা বেগম ও কুমিল্লার দেবিদ্বারে শহীদ আব্দুর রাজ্জাক রুবেলের মা হাসনা বেগম।
ট্রাইব্যুনালে তৃতীয় সাক্ষী হিসাবে আন্দোলনে শহীদ বরিশাল কাজির হাট একতা ডিগ্রি কলেজের এইচ এস সি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মারুফ হোসেন বাবা মো. ইদ্রিস হোসেন বলেন, তিনি পেশায় একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। মারুফ লেখাপড়ার পাশাপাশি ছুটি পেলে ঢাকায় এসে ব্যবসায় তাকে সহায়তা করতো । মারুফ জুলাই আন্দোলনে চলাকালে সে বাড্ডায় এলাকায় অংশ নেয়। তিনি বলেন, ১৯ জুলাই সকাল সাড়ে নয়টায় মারুফ বাসা থেকে বের হয়। তার সঙ্গে মামা ফয়সাল আহমেদ ছিল। জুমার নামাজের পরে তারা বাসায় এসে খাওয়া দাওয়া করে।এরপর পুনরায় তারা সাড়ে তিনটায় বের হয়।
মারুফের বাবা জানান, ফয়সাল আমাকে ফোন করে বলেন, রামপুরা ব্রীজের ওপর থেকে পুলিশ,বিজিবি ও ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছুঁড়েছে। এরপর তিনি পৌঁনে পাঁচটার দিকে তিনি জানতে পারেন, বাড্ডা ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে মারুফ গুলিবিদ্ধ হয়েছে। তখন তাকে এমএমজেড হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে এ্যাম্বুলেন্স করে ঢাকা মেডিকেল নেওয়ার পথে রামপুরা ব্রীজের ওপর আওয়ামীলীগ, পুলিশ ও বিজিবি মিলে এ্যাম্বুলেন্সটি ১৫-২০ মিনিট আঁটকে রেখে এবং তারা বলে সে মারা গেছে । এসময় তারা মারুফকে বাসায় নিয়ে যাওয়ার জন্য বলে।
মো. ইদ্রিস বলেন, আমার ছেলের গামছা দিয়ে পেছানো ছিল। একজন পুলিশ রাইফেলের বাট দিয়ে গুলিবিদ্ধ স্থানটি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখে এসময় আমার ছেলে যন্ত্রণায় কাতারাতে থাকে। এরপর তাকে ঢাকা মেডিকেল হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সন্ধ্যা সাতটা ৩০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
লক্ষীপুর সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী আমেনা বেগম বলেন, লক্ষীপুরে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন গত বছর ১৬ জুলাই আবু সাঈদ হত্যারকান্ডের ঘটনায় পুরোদমে শুরু হয়। হাসিনা যখন শিক্ষার্থীদের রাজাকারের বাচ্চা বলে গালি দেন তখন এ আন্দোলন আরো চাঙ্গা হয়ে উঠে। এরপর ২৯ জুলাই সকালে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা স্থানীয় উপজেলা পরিষদ বাগবাড়ি মোড়ে জড়ো হয়। তিনি বলেন, এ সময় পুলিশের সাথে সাথে ছাত্রলীগ-যুবলীগের সন্ত্রাসীরা ছাত্রদের উপর চড়াও হয়ে ব্যাপক মারধর করে। তারা মেয়েদের উপরও হামলা করে। আন্দোলন যখন চুড়ান্ত মূহুর্তে ৪ আগস্ট লক্ষীপুর বাগবাড়ি মোড় এলাকা হতে মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা যখন ঝুমুড় চত্বরে উপস্থিত হয়,তখন মাদাম ব্রীজ দিক হতে সশন্ত্র আওয়ামী সন্ত্রাসীরা গুলি করতে করতে এগিয়ে আসে। এ সময় আমরা ৩০/৪০ জন শিক্ষার্থী মাদাম ব্রীজের দিকে এগিয়ে গেলে ছাত্র লীগ সন্ত্রাসীদের গুলিতে আমার পাশের একজন ছাত্র রাস্তায় পড়ে যায়। পড়ে তার নাম জেনেছি সাদ আল আফনান। এরপর সন্ত্রাসীরা আমাকে ধাওয়া করে আমাকে ধরে ফেলে এবং লাঠিসোটা ও ইট দিয়ে নানাভাবে আমাকে মেরে আহত করে। পরে দুজন আন্দোলনকারী আমাকে লক্ষীপুর সরকারি হাসপাতালে পৌছে দেয়। হাসপাতালে দুদিন ভর্তি থাকার পর বাড়িতে যাবার পর শুনি লক্ষীপুরে সেদিন ৪/৫ জন শহীদ হয়। আহত হয় দুই শতাধিক আন্দোলনকারী। শিক্ষার্থী আমেনা আক্তার এসব ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ সংশ্লিস্টদের ফাঁসি দাবী করেন।
হাসনা বেগম বলেন, আমার ছেলে ৪ আগস্ট সকাল ১০ টায় নাস্তা খেয়ে বাড়ি হতে বের হয়ে আন্দোলনে যায়। বেলা দেড় টায় স্থানীয় একজন জানায়, আমার ছেলে আন্দোলনে আহত হয়েছে। একথা জানার পর আমি দৌড়ে ঘটনাস্থল দেবীদ্বার বাড়েরা রোডের আজগর আলী স্কুলের কাছে যাই । সেখানে প্রচুর রক্ত দেখতে পাই। পরে আমাকে দেবীদ্বার সরকারি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখানে আমার ছেলের লাশ দেখে বার বার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। হাসনা বেগম বলেন, পরবর্তীতে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তাফিজ সরকার নগদ ৭ লাখ টাকা ও দুটি দোকান দেবার লোভ দেখিয়ে কোন মামলা না করতে বলে। তিনি জানান, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সালাহ উদ্দিনসহ আওয়ামী সন্ত্রাসীরা তার ছেলে হত্যায় জড়িত ।তিনি ছেলের হত্যাকারীদের সর্বোচ্চা বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ২৬ আগস্ট দিন ধার্য করেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে গতকাল শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম, প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, গাজী এস এইচ তামিম, বি এম সুলতান মাহমুদ ও ফারুক আহাম্মদ প্রমুখ । একসময় অপর প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন। এদিকে এই মামলায় পলাতক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে জেরায় ছিলেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। এদিকে এই মামলায় গ্রেফতার হয়ে রাজসাক্ষী হওয়া সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন আজ সাক্ষ্য গ্রহণের সময় কাঠগড়ায় হাজির ছিলেন।
এখন পর্যন্ত এই মামলায় ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়েছে ।
সবার দেশ/এফও




























