Sobar Desh | সবার দেশ নিজস্ব প্রতিবেদক 

প্রকাশিত: ০০:০৭, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

আপডেট: ০০:০৯, ২৩ নভেম্বর ২০২৫

শিল্প ধসের দায় এড়িয়ে ‘ক্ষমতা জোরদার’ চিন্তা—বক্তাদের প্রশ্ন

বীমা খাতে অনাচার ঢাকতেই কি আইন সংশোধন তৎপরতা?

বীমা খাতে অনাচার ঢাকতেই কি আইন সংশোধন তৎপরতা?
ছবি: সংগৃহীত

এক দশকের বেশি সময় ধরে অনিয়ম, তহবিল তছরুপ, ভুয়া দাবি নিষ্পত্তি, অবৈধ কমিশন বাণিজ্য, দায়হীন পরিচালনা পর্ষদ এবং নিয়ন্ত্রকের কাঠামোগত ব্যর্থতার কারণে ধুঁকে পড়া বীমা খাত। অথচ সংকটের মূল কারণগুলো সমাধান না করে উল্টো বীমা আইন ২০১০ সংশোধনে আইডিআরএ’র ক্ষমতা বাড়ানোর তৎপরতা এ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

শনিবার (২২ নভেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি আয়োজিত ‘বীমা আইন ২০১০ সংশোধন’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা সরাসরি অভিযোগ তোলেন—

  • সংস্কারের নামে আইন সংশোধনের প্রস্তাব আসলে ‘ক্ষমতার পুনর্বণ্টন’ ছাড়া কিছু নয়।
  • শিল্পকে পুনরুদ্ধার করার জন্য প্রয়োজন আইনের সঠিক প্রয়োগ, আইনের পাহাড়সম সংশোধন নয়।

বীমা খাত ভাঙার মূল শেকড়—প্রশাসনিক অদক্ষতা ও নিয়ন্ত্রকের সদিচ্ছার অভাব

মতবিনিময় সভায় বক্তারা একাধিকবার প্রশ্ন তোলেন—২০১০ সালে প্রণীত বীমা আইন বাস্তবায়নেই যখন আইডিআরএ সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তখন সে আইনের সংশোধন করে কী অর্জন সম্ভব?

বক্তাদের বক্তব্যে উঠে আসে—

  • বীমা কোম্পানি তদন্তের জন্য ৪৮ ধারা,
  • বিশেষ নিরীক্ষার জন্য ২৯ ধারা,
  • প্রশাসক নিয়োগের জন্য ৯৫ ধারা,
  • পরিচালনা পর্ষদ অপসারণের বিধান ৫০ ধারা,
  • তহবিল পুনরুদ্ধারের বিধান ১৩৫-১৩৬ ধারা

এ সবই আইনে ছিলো, কিন্তু আইডিআরএ প্রয়োগ করেনি।

ফলে বক্তাদের ভাষায়:

সংস্কারের সংকট আইনে নয়, সংকট নিয়ন্ত্রকের সদিচ্ছায়।

জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পরও নিষ্ক্রিয়তা—লাইফ খাতের তছরুপ হওয়া কোটি কোটি টাকা অদৃশ্যই রয়ে গেছে

বক্তারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন—

  • লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোতে বহু বছরের তহবিল তছরুপের হিসাব নেই,
  • গ্রাহকদের অর্ধলক্ষাধিক দাবি বছরের পর বছর ঝুলে আছে,
  • কিন্তু আইডিআরএ একটিও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেয়নি,
  • তহবিল পুনরুদ্ধারেও নেয়নি কোনও পদক্ষেপ।

নন-লাইফ বীমা খাতেও একই চিত্র—অবৈধ কমিশন বাণিজ্যেই ধসে পড়েছে বাজার। কিন্তু আইডিআরএ একবারও কঠোর অভিযান পরিচালনা করেনি।

বক্তারা বলেন,

  • সংস্কারের কথা না বলে আইডিআরএ যদি আইন প্রয়োগ করত, আজ খাতের এ দশা হতো না।
  • নিয়ন্ত্রক সংস্থায় ‘অভিজ্ঞতা-বর্জিত’ প্রেষণ কর্মকর্তারা—বিমা শিল্পের বাস্তবতা বোঝার কেউ নেই

বক্তারা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন—

২০১০ সালে আইডিআরএ গঠিত হওয়ার পর থেকে সংস্থাটি প্রেষণে আসা সরকারি কর্মকর্তা দিয়ে চলছে, যাদের বীমা খাতে বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই।

ফলে—

  • আইন প্রয়োগে দুর্বলতা
  • শিল্পের সংকট বিশ্লেষণে অদক্ষতা
  • অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা
  • কোম্পানি পরিচালনায় অস্থিরতা

এ সবই যুক্ত হয়েছে খাতের দুরবস্থায়।

আইন সংশোধনের নামে নতুন সংকট—চেয়ারম্যান নিয়োগ থেকে সিএফও পর্যন্ত আইডিআরএ-এর অনুমোদন!

বক্তারা সন্দেহ প্রকাশ করেন, বীমা আইন সংশোধনীতে তফসিল-১ বাদ দেওয়া, কোম্পানির চেয়ারম্যান নিয়োগ, অতিরিক্ত এমডি, সিএফও, কোম্পানি সেক্রেটারি নিয়োগে আইডিআরএ-এর অনুমোদনের মতো বিধান কোম্পানি পরিচালনায় বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

কারণ:

  • নির্বাচিত চেয়ারম্যানের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে।
  • পরিচালকরা আদালতে যেতে পারেন—নতুন সংকট তৈরি হবে।
  • নিয়ন্ত্রকের অতিরিক্ত কর্তৃত্ব দুর্নীতিকে আরও স্থায়ী করতে পারে।

বক্তাদের মতে—

যেখানে নিয়ন্ত্রকের ওপরই আস্থা নেই, সেখানে তার হাতে আরও ক্ষমতা দিলে খাত আরও অন্ধকারে যাবে।

আইডিআরএ সংশোধনী—নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো, কিন্তু উন্নয়নের কোনো রূপরেখা নেই

আইডিআরএ’র সাবেক সদস্য (লাইফ) সুলতান-উল-আবেদীন মোল্লার প্রধান প্রবন্ধে উঠে আসে উদ্বেগজনক তথ্য:

  • বীমা আইন ২০১০-এর ১৬০টি ধারার মধ্যে ৯৯টি ধারা একই রেখে তাদের উপধারা পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে,
  • বাকি ৬১টি ধারা উপধারাসহ তীব্র পরিবর্তন, সংশোধন বা বাতিল করার প্রস্তাব,
  • ৬৪টি নতুন ধারা যুক্ত করার উদ্যোগ।

কিন্তু এত বড় কাঠামোগত পরিবর্তনে বীমা উন্নয়নের কোনো প্রস্তাব নেই— আছে শুধু নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার ধারা।

তিনি বলেন, বীমা খাত উন্নয়ন না করে কেবল ক্ষমতা বাড়ালে খাত আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কঠিন বাস্তবতা—আইডিআরএ প্রতিষ্ঠার পর কোম্পানি বেড়েছে, কিন্তু ব্যবসা অর্ধেকে নেমেছে

প্রধান প্রবন্ধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ:

আইডিআরএ প্রতিষ্ঠার আগে লাইফ খাতে পলিসিহোল্ডার ছিল ১ কোটি। এখন তা কমতে কমতে ৫০ লাখ নেমেছে।

অর্থাৎ—

  • কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে,
  • কিন্তু গ্রাহকের আস্থাই ভেঙে পড়েছে।

বক্তাদের মতে, এটি আইডিআরএ-এর ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

অনুসন্ধানী প্রশ্ন—আইন সংশোধন কি শিল্প বাঁচানোর জন্য, নাকি কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য?

বক্তারা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেন—

  • আইডিআরএ এখনো রুলস-রেগুলেশন প্রণয়ন সম্পন্ন করতে পারেনি, তবে কি আইন সংশোধন প্রয়োজন?
  • ২০১০ থেকে ২০২৫—১৫ বছরে পলিসিহোল্ডার ফান্ড কেনো গঠন করা হয়নি?
  • মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানকে বীমা ব্যবসার সুযোগ দিলে কি শিল্প আরও অবনতি হবে না?
  • চেয়ারম্যানের ‘যৌক্তিক মনে করা’—এ অস্পষ্ট শব্দচয়ন কি ভবিষ্যৎ অপব্যবহারের দরজা খুলে দেবে না?
  • নতুন পরিচালনা পর্ষদ ব্যর্থ হলে দায় নেবে কে?

এসব প্রশ্নই দেখায়—সংশোধনীতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে।

পরিবারের সংজ্ঞা বিস্তৃত করে নাতি-নাতনি, জামাতা–বউমা—এটি কেনো?

কাজী মো. মোরতুজা আলী এই সংজ্ঞার অসঙ্গতি তুলে ধরে বলেন— পরিবারের সংজ্ঞায় অতিরিক্ত ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করা হলে স্বার্থের সংঘাত আরও বাড়তে পারে। এর আলাদা প্রয়োজন নেই।

সিএফও পর্যন্ত নিয়োগ অনুমোদন—নিয়ন্ত্রকের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপের ঝুঁকি

বক্তারা বলেন— সিএফও, অতিরিক্ত এমডি, কোম্পানি সেক্রেটারি এদের নিয়োগেও আইডিআরএ অনুমোদন প্রয়োজন—এটি বিশ্বের কোনো বীমা খাতে অনুসৃত মডেল নয়। এ ধরনের নিয়ন্ত্রণকে বক্তারা বলেছেন—

  • উন্নয়ন নয়, এটি হলো নিয়ন্ত্রকের নতুন ক্ষমতার দৌড়।
  • ইন্স্যুরটেক ও করপোরেট এজেন্ট—সংজ্ঞা আছে, কাঠামো নেই

সংশোধনীতে ইন্স্যুরটেকের সংজ্ঞা দেয়া হলেও— কীভাবে গঠিত হবে, কীভাবে পরিচালিত হবে, কে নিয়ন্ত্রণ করবে তা উল্লেখ করা হয়নি। করপোরেট এজেন্ট নিয়োগের সংজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে কোনো প্রক্রিয়া নেই।

সংস্কারের সময় কি এখন? নাকি পরবর্তী সরকারের ম্যান্ডেটের অপেক্ষা থাকা উচিত?

বক্তাদের যুক্তি—

  • আইন সংসদে পাস হয়,
  • অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমন বড় সংশোধন গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করবে,
  • পরবর্তী সংসদ এ আইন বাতিল করে দিলে সব পরিশ্রমই বৃথা যাবে।

ফলে তারা বলেন— এখন আইন সংশোধন নয়, বিদ্যমান আইনের সঠিক প্রয়োগই জরুরি।

বীমা করপোরেট গভর্নেন্সে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত?

সংশোধনী আইনে পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের প্রস্তাব করে আইডিআরএ নিজেই পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগ করতে চায়। কিন্তু বক্তারা সতর্ক করেন—

  • নতুন পরিচালনা পর্ষদ ব্যর্থ হলে দায় নেবে কে?
  • স্বচ্ছতা কোথায়?
  • জবাবদিহিতা কীভাবে নিশ্চিত হবে?

সব মিলিয়ে এ প্রস্তাবকে তারা বলেছেন— পরিচালনা কাঠামোর অকারণে ছুরি চালানো।

উপসংহার: বীমা খাতকে বাঁচাতে সংশোধনী নয়—সদিচ্ছা ও প্রয়োগই হলো মূল শক্তি

মতবিনিময় সভার সারকথা—

  • বীমা খাতের সমস্যা নতুন নয়,
  • আইনও নতুন নয়,
  • পরিবর্তন হয়নি শুধু আইন প্রয়োগের মানসিকতা।

বক্তারা স্পষ্ট করে বলেন—

আইন সংশোধনের নামে নিয়ন্ত্রকের ক্ষমতা বৃদ্ধি বীমা খাতকে আরও অচল করবে। শিল্পের স্বার্থে এখনই গভীর পরীক্ষা–নিরীক্ষা জরুরি।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন— বিআইপিডি মহাসচিব কাজী মো. মোরতুজা আলী, অর্থকাগজ সম্পাদক প্রণব মজুমদার, ডিআরইউ সভাপতি গাজী আনোয়ারসহ প্রিন্ট ও বীমা খাত সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি। সভা পরিচালনা করেন ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডির সম্পাদক ও প্রকাশক মোস্তাফিজুর রহমান টুংকু।

সবার দেশ/কেএম