বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় বড় ধাক্কা
বিচারব্যবস্থায় দুই বিল রহিতকরণে ভয়াবহ সংকটের আশঙ্কা
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল বাতিলের ফলে দেশের বিচারব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিচারপতি, আইনজীবী ও সাবেক বিচারকরা। তাদের মতে, এ সিদ্ধান্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং দেশকে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে।
শনিবার (১১ এপ্রিল) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল হতে লেগেছে ৫৫ বছর, স্বাধীনতা আর কতদূর?’ শীর্ষক মুক্ত আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন’ ও ‘আইন ও বিচার’ পত্রিকা।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে আপিল বিভাগের বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, সংবিধানে এত বেশি কাটাছেঁড়া হয়েছে যে এখন তা সংস্কার অপরিহার্য। তিনি বলেন, যদি গণঅভ্যুত্থানকে বৈধ ধরা না হয়, তবে অন্তর্বর্তী সরকারের অধিকাংশ সিদ্ধান্তই অবৈধ হয়ে যাবে, এমনকি বর্তমান সরকারের বৈধতাও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
তিনি আরও বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার দাবি ৫৫ বছরের নয়, এটি দীর্ঘদিনের সর্বজনীন দাবি। অধ্যাদেশ রহিতের মাধ্যমে সরকার জনগণের প্রত্যাশা থেকে সরে এসেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের ২৮ কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং বিচার বিভাগ নিয়ে মতপ্রকাশের প্রতিবাদে জারি করা নোটিশের সমালোচনা করেন তিনি।
রাষ্ট্রপতির সাম্প্রতিক বক্তব্য প্রসঙ্গে বিচারপতি আবদুল মতিন বলেন, যদি রাষ্ট্রপতি দাবি করেন তাকে জোর করে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়েছে, তবে তা শপথভঙ্গের শামিল; সেক্ষেত্রে তার পদত্যাগ করা উচিত, এমনকি তিনি ইমপিচযোগ্যও হতে পারেন।
সাবেক জেলা জজ মাসদার হোসেন বলেন, বিচার বিভাগকে সামনে এগিয়ে নেয়ার বদলে এ বিল রহিতের মাধ্যমে পিছিয়ে দেয়া হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ বাতিল করে আবারও দলীয় বিবেচনায় বিচারক নিয়োগের পথ খুলে দেয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিক বলেন, এ সিদ্ধান্ত দেশকে কঠিন পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে এর রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হাসান তারিক চৌধুরী বলেন, অতীতের মতো বর্তমান সরকারও স্বাধীন বিচার বিভাগ চায় না। তারা এমন বিচারক চায়, যারা ক্ষমতাসীনদের প্রতি অনুগত থাকবে।
ব্যারিস্টার ওমর ফারুক বলেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ভিত্তিতে হওয়া অধ্যাদেশ বাতিল করে জনগণের কী উপকার হলো, তার জবাব সরকারকে দিতে হবে। অন্যথায় সামনে আরও কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।
সাবেক যুগ্ম জেলা জজ ও আইনজীবী ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, এ সিদ্ধান্ত সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে। তিনি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে দীর্ঘ সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
জুলাই ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি আরিফ সোহেল বলেন, অধ্যাদেশ বাতিলের মাধ্যমে সরকার জুলাইয়ের চেতনার বিপরীত পথে হাঁটছে। আমরা এমন বিচার বিভাগ চাইনি, যা নির্বাহী বিভাগের দিকে তাকিয়ে থাকবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও ‘আইন ও বিচার’ পত্রিকার সম্পাদক মুহাম্মদ শফিকুর রহমান বলেন, এ রহিতকরণ গণতন্ত্রের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করবে এবং আদালতকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের সুযোগ বাড়াবে। এর ফলে বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হবে এবং সাধারণ মানুষের আদালতের ওপর আস্থা আরও কমে যাবে।
সবার দেশ/কেএম




























