অভিবাসীদের ঘৃণায় জ্বলছে ফ্রান্স: ট্রাম্প
বিক্ষোভ-সহিংসতার জন্য অভিবাসীদের দায়ী করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট; ট্রাম্পের সুরে সুর ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সেরও।
ফ্রান্সে চলমান বিক্ষোভ ও সহিংসতার জন্য দেশটিতে বসবাসকারী অভিবাসীদের দায়ী করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, অভিবাসীদের হৃদয়ে থাকা ঘৃণার আগুনে একসময়ের মহান ফ্রান্স ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সীমান্ত বন্ধ করারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
রোববার নিজের সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন,
ফ্রান্স জ্বলছে! সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগত থেকে আসা মানুষ—যাদের হৃদয়ে রয়েছে ঘৃণা—তারা একসময়ের মহান এ দেশটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। অনেক দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই সীমান্ত বন্ধ করুন এবং পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নিন!
ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে ট্রাম্পের এ মন্তব্যের মধ্য দিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ সংকটকে অভিবাসননীতির সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়টি আবারও সামনে এসেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও ফ্রান্সসহ পশ্চিমা দেশগুলোর অভিবাসননীতি নিয়ে সমালোচনা করেছেন।
জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শুরু বিক্ষোভ
ফ্রান্সে বিক্ষোভের সূত্রপাত হয় গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। স্কুলে আরও শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার দাবিতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা আন্দোলন শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে শান্তিপূর্ণ এ আন্দোলনে পরে বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন এবং জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে উদ্বিগ্ন মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষ যুক্ত হন।
গত শনিবার উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এতে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। অন্যদিকে দেশটির শ্রমিক অধিকার সংগঠন সিজিটি ইউনিয়নের দাবি, বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ।
বিক্ষোভকারীদের ঘোষিত দাবির কেন্দ্রে রয়েছে দ্রব্যমূল্য, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি পরিষেবা। এসব দাবির সঙ্গে অভিবাসনকে সরাসরি যুক্ত করা হয়নি। তবে বিক্ষোভের একপর্যায়ে বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও সরকারি ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে। ফলে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের পাশাপাশি সহিংসতাও পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে।
গ্রেফতার, অগ্নিসংযোগ ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
বিক্ষোভের পর ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা লরেন্ট নুনেজ রোববার সোশ্যাল মিডিয়া এক্সে জানান, প্রায় ১ হাজার ৮০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে তদন্ত চলছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্যারিস পুলিশ জানিয়েছে, রাজধানীতে এক রাতেই ৮৫৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শহরের বিভিন্ন সড়কে পোড়া সাইকেল, ডাস্টবিন ও অন্যান্য সামগ্রী দিয়ে তৈরি ব্যারিকেডের ধ্বংসাবশেষ পড়ে থাকতে দেখা যায়। বেশ কয়েকটি এলাকায় দোকানের ভাঙা কাচ এবং পুড়ে যাওয়া গাড়িও দেখা গেছে।
প্যারিসসহ অন্যান্য শহরে মুখোশধারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দোকানপাটে লুটপাট ও বিভিন্ন স্থাপনায় হামলার অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় পুলিশ, দমকলকর্মী ও জরুরি চিকিৎসাসেবার কর্মীরাও আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্রান্স নিয়ে আগেও কটাক্ষ করেছিলেন ট্রাম্প
ফ্রান্সের অস্থিরতা নিয়ে ট্রাম্পের মন্তব্য এবারই প্রথম নয়। এর আগেও দেশটিতে সহিংসতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছিলেন তিনি। ফ্রান্সকে বিপ্লবের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে উল্লেখ করে সেখানে গিয়ে বিপ্লবে যোগ দেয়ার কথাও বলেছিলেন ট্রাম্প।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ তার রাজনৈতিক কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বিষয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর অবৈধ অভিবাসন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেন তিনি। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের সঙ্গে অভিবাসনের যোগসূত্র টানাও তার বক্তব্যের একটি নিয়মিত বৈশিষ্ট্য।
ভ্যান্সের অভিযোগ পশ্চিমা উদারপন্থীদের বিরুদ্ধে
ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্সও সোশ্যাল মিডিয়া এক্সে মন্তব্য করেছেন। তার বক্তব্য, পশ্চিমা উদারপন্থীরা বৈচিত্র্য ও সহানুভূতির যুক্তি তুলে ধরে তৃতীয় বিশ্বের মানুষকে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশে নিয়ে গেছেন। কিন্তু অভিবাসীদের স্থানীয় সমাজের সঙ্গে আত্মীকরণ ও সাংস্কৃতিক সামঞ্জস্যের প্রশ্ন যথাযথভাবে বিবেচনা করেননি।
ভ্যান্স আরও বলেন, ফ্রান্সের সরকারকে আগেই এ ধরনের পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিলো, কিন্তু সে সতর্কতা গুরুত্ব পায়নি। তিনি দেশটিতে আরও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগেই সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে ডেমোক্র্যাটদের অভিবাসননীতির সমালোচনাও করেন তিনি।
তবে ফ্রান্সের চলমান বিক্ষোভের প্রাথমিক দাবিগুলো মূলত জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবাকে কেন্দ্র করে। ফলে দেশটির অস্থিরতার কারণ হিসেবে অভিবাসনকে দায়ী করার বক্তব্য ট্রাম্প ও ভ্যান্সের রাজনৈতিক মূল্যায়ন; বিক্ষোভের ঘোষিত দাবির সঙ্গে তা এক নয়।
সহিংসতায় জড়িতদের শাস্তির ঘোষণা ম্যাক্রোঁর
এদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ রোববার এক বিবৃতিতে বলেছেন, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবশ্যই শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এখন ফরাসি সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবা নিয়ে জনঅসন্তোষের প্রতিফলন, অন্যদিকে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতির ঘটনাও সামনে এনেছে। এ পরিস্থিতিকে অভিবাসননীতির ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন ট্রাম্প ও ভ্যান্স। তবে বিক্ষোভের কারণ, অংশগ্রহণকারীদের দাবি এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয়—এসব বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করেই পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র বোঝা প্রয়োজন।
সবার দেশ/এমকেজে




























