পাঁচ দিনেই বিদায় ট্রাম্পের প্রেস সেক্রেটারি জাকারিয়ার!
ব্রিফিংয়ে বিতর্ক, আইনি যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ও গণমাধ্যমের সমালোচনায় পদচ্যুতির মুখে কেটি জাকারিয়া।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন হোয়াইট হাউস প্রেস সেক্রেটারি কেটি জাকারিয়ার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হলো মাত্র পাঁচ দিনেই। প্রথম প্রেস ব্রিফিংয়ে ব্যর্থতা, আইনজীবী হিসেবে তার যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক এবং গণমাধ্যমের ধারাবাহিক সমালোচনার মুখে তাকে এ পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে প্রশাসন জানিয়েছে, জাকারিয়া হোয়াইট হাউসে অন্য কোনও ভূমিকায় কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।
শুক্রবার বিকেলে জর্জিয়ায় একটি মধ্যবর্তী নির্বাচনী জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। এ সময় জাকারিয়ার ভবিষ্যৎ দায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, জাকারিয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। ট্রাম্পের ভাষায়,
সত্যি বলতে, আমি তোমার জায়গায় হলে পুনর্বিবেচনা করতাম। কেটি, তোমার কি এ চাপের দরকার আছে? আমার মনে হয় তোমার দরকার নেই।
ট্রাম্পের এ মন্তব্যের পরই জাকারিয়ার পদচ্যুতির বিষয়টি সামনে আসে। ঘটনার সঙ্গে পরিচিত তিন ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, তাকে প্রেস সেক্রেটারির দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।
হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চুং পরে জানান, জাকারিয়া একটি নতুন দায়িত্বে যুক্ত হবেন। তবে তার পরবর্তী পদ বা দায়িত্বের বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। ট্রাম্পও ইঙ্গিত দিয়েছেন, জাকারিয়া তার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে পারেন, তবে সেটি হবে তুলনামূলকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যময় কোনও ভূমিকায়।
প্রথম ব্রিফিংয়েই বিপর্যয়
গত সপ্তাহের শুক্রবার ফক্স নিউজের তুলনামূলকভাবে অপরিচিত ও অবৈতনিক ভাষ্যকার কেটি জাকারিয়াকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তার কাছেই তিনি ছিলেন অপরিচিত মুখ। তবে প্রেসিডেন্টের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ন্যাটালি হার্পের সমর্থন তার নিয়োগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও জাকারিয়া তখনও ওয়াশিংটনে স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হননি। পরদিন মঙ্গলবার তার প্রথম প্রেস ব্রিফিং অনুষ্ঠিত হয়। শুরু থেকেই নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিলো সে ব্রিফিং।
ব্রিফিংয়ে মূলত লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান জাকারিয়া। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেয়ার পর্বও স্থায়ী হয় মাত্র সাড়ে পাঁচ মিনিট। হোয়াইট হাউসের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মুখপাত্র হিসেবে তার প্রস্তুতি ও দক্ষতা নিয়ে এরপরই প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
তবে সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয় তার আইনি যোগ্যতা নিয়ে। ট্রাম্প তাকে ‘অ্যাটর্নি’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিলেও পরে প্রকাশ্যে আসে, তিনি বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হননি। যুক্তরাষ্ট্রে আইন পেশায় প্রবেশের জন্য সংশ্লিষ্ট বিচারব্যবস্থার নির্ধারিত শর্ত পূরণ এবং সাধারণত বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জাকারিয়ার পেশাগত পরিচয় নিয়ে গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
সাংবাদিকের প্রশ্নে অস্বস্তি
হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদক জাকারিয়াকে বারবার প্রশ্ন করেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কোন অঙ্গরাজ্যে বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
জবাবে জাকারিয়া দুবার বলেন, যখন আমি চীনে চলে যাই। তার এই উত্তর পরিস্থিতিকে আরও বিব্রতকর করে তোলে। পরে তিনি দাবি করেন, প্রশ্নটি তিনি ভুল শুনেছিলেন।
কিন্তু সে সময় ট্রাম্প তার কাছাকাছিই দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং প্রতিবেদকের প্রশ্নটি আবারও তাকে শুনিয়ে দেন। তারপরও ঘটনাটি নিয়ে বিতর্ক থামেনি। বরং তার পেশাগত যোগ্যতা, প্রস্তুতি এবং সাংবাদিকদের প্রশ্ন সামলানোর সক্ষমতা নিয়ে সমালোচনা আরও জোরালো হয়।
ফক্স নিউজেও সামলাতে পারেননি চাপ
বিতর্কের আগুন আরও ছড়িয়ে পড়ে বৃহস্পতিবার রাতে ফক্স নিউজের উপস্থাপক শন হ্যানিটির অনুষ্ঠানে জাকারিয়ার সাক্ষাৎকারের পর। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত হ্যানিটি সেখানে তার আইনি যোগ্যতা নিয়ে কঠোর প্রশ্ন তোলেন। সাক্ষাৎকারে জাকারিয়াকে বেশ অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
শুক্রবার সকালে ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানেও তাকে একই ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক লরেন্স জোনস সরাসরি জানতে চান, বার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ার বিষয়টি তিনি প্রেসিডেন্টকে জানিয়েছেন কি না।
জাকারিয়া উত্তরে বলেন, লরেন্স, ওই প্রশ্নগুলো আমাকে করা হয়নি।
তবে তার এ জবাবও বিতর্ক প্রশমিত করতে পারেনি। বরং নিয়োগের আগে তার যোগ্যতা যাচাই করা হয়েছিলো কি না, সে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
প্রশাসনের অবস্থানেও পরিবর্তন
জাকারিয়ার নিয়োগের পরপরই হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে তার প্রতি সমর্থনের কথা জানানো হয়েছিলো। বুধবার সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া এক পোস্টে যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চুং দাবি করেন, হোয়াইট হাউসের সর্বস্তরের কর্মকর্তারা জাকারিয়ার কাজে গভীরভাবে মুগ্ধ। তিনি আরও বলেছিলেন, ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদ শেষে জাকারিয়াকে অন্যতম সেরা প্রেস সেক্রেটারি হিসেবে স্মরণ করা হবে।
কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। প্রথম ব্রিফিংয়ের ব্যর্থতা এবং আইনি যোগ্যতা নিয়ে বিতর্কের পর প্রশাসন তাকে ওই পদে বহাল রাখেনি।
শুক্রবার রাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া এক পোস্টে জাকারিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে কাজ করার সুযোগকে সম্মানের বলে উল্লেখ করেন। তিনি প্রেসিডেন্টকে দয়ালু, চমৎকার, উদার, বিবেচক, উৎসাহী ও পরিশ্রমী ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেন। একই সঙ্গে আরও বেশি আমেরিকানের ট্রাম্পের কাজের মূল্যায়ন করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন।
তার এ বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, পদ হারালেও ট্রাম্পের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে তিনি পিছপা হননি। তবে নতুন দায়িত্বে তিনি কীভাবে এবং কতটা সক্রিয় থাকবেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এক সপ্তাহে একাধিক অস্থিরতা
জাকারিয়ার পদচ্যুতির ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে একাধিক বিতর্ক ও পালাবদল নিয়ে আলোচনা চলছিলো।
একই সপ্তাহে মঙ্গলবার জাকারিয়ার প্রথম প্রেস ব্রিফিং চলাকালেই গ্রিসে মার্কিন রাষ্ট্রদূত কিম্বার্লি গিলফয়েলকে টেলিভিশনে ঘোষণার মাধ্যমে বরখাস্ত করা হয়। এ ছাড়া ট্রাম্পের দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী রিচার্ড গ্রেনেল ও আলিনা হাব্বা মিলডনের মধ্যে বিরোধ মেটাতেও প্রেসিডেন্টকে সময় দিতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের আস্থাভাজন পাওলো জাম্পোল্লিকে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ্যে আসার পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলসের কন্যা এবং তার ঘনিষ্ঠ মহলের বিদেশে অর্থ উপার্জন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এসব ঘটনার পাশাপাশি জাকারিয়ার দ্রুত পদচ্যুতি প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা, নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
স্কারামুচির রেকর্ডও ছাড়ালেন জাকারিয়া
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেও হোয়াইট হাউসের শীর্ষ পদে স্বল্প সময় দায়িত্ব পালনের নজির ছিলো। সে সময় অ্যান্থনি স্কারামুচি হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার মাত্র ১০ দিনের মাথায় বরখাস্ত হয়েছিলেন। তার সে সংক্ষিপ্ত মেয়াদ তখন আলোচনার জন্ম দিয়েছিলো।
এবার জাকারিয়ার ক্ষেত্রে সময়টা আরও কম—মাত্র পাঁচ দিন। ফলে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি পদে তার মেয়াদ সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম সংক্ষিপ্ত মেয়াদ হিসেবে আলোচনায় এসেছে।
জাকারিয়ার পদচ্যুতির খবর প্রকাশের পর সোশ্যাল মিডিয়া এক্সে প্রতিক্রিয়া জানান স্কারামুচি। তিনি লেখেন, রেকর্ড ভাঙার জন্যই তৈরি হয়। তবে অন্যের কষ্টে আমি কোনও আনন্দ পাই না।
সব মিলিয়ে, জাকারিয়ার বিদায় শুধু একজন প্রেস সেক্রেটারির স্বল্পস্থায়ী নিয়োগের ঘটনা নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের নিয়োগপ্রক্রিয়া, গণমাধ্যমের সঙ্গে সম্পর্ক এবং উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন দায়িত্বে জাকারিয়াকে কীভাবে কাজে লাগানো হয় এবং তাঁর এই দ্রুত পদচ্যুতি হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ ব্যবস্থায় কী ধরনের পরিবর্তন আনে।
সবার দেশ/এমকেজে




























