গুম ও নির্যাতনের সাক্ষ্য দিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর
সেনানিবাসে কর্মরত অবস্থায়ই গুমঘরে নেয়া হয়
খুনী হাসিনার শাসনামলে জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল (জেআইসি) বা আলোচিত ‘আয়নাঘর’ গুমকক্ষের ভেতরের ভয়াবহ চিত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তুলে ধরেছেন সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (বরখাস্ত) মো. হাসিনুর রহমান। গুম ও নির্যাতনের মামলায় তিনি দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে রোববার (২৫ জানুয়ারি) জবানবন্দি দেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এদিন তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
জবানবন্দিতে হাসিনুর রহমান জানান, ২০১১ সালের ৯ জুলাই ময়মনসিংহ সেনানিবাসে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাকে প্রথম দফায় গুম করা হয়। হরকাতুল জিহাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততার মিথ্যা অভিযোগে তাকে ৪৩ দিন গুম রেখে পরে সেনা আদালতে চার বছরের সাজা দেয়া হয়। তিনি বলেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ সাজানো ও ভিত্তিহীন ছিলো।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৮ আগস্ট দ্বিতীয় দফায় তাকে আবারও গুম করা হয়। মুক্তি পান ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। দ্বিতীয় দফা গুমের ঘটনার বর্ণনায় তিনি বলেন, দ্বিতীয় দফায় গুমের দিন সন্ধ্যায় মিরপুর ডিওএইচএস-এ আমার বাসায় আসেন বন্ধু লেফটেন্যান্ট কর্নেল যায়িদ আবদুল্লাহ। বাইরে ঘুরতে বের হওয়ার জন্য অনেক চাপাচাপি করেন তিনি। পরে আমরা ঘুরতে বের হই। দুই ঘণ্টা ঘোরাঘুরি শেষে একই এলাকায় মেজর মহসিনের বাসায় যাই। সেখান থেকে রাত ১০টায় বের হই। আমার পেছনে ছিলেন যায়িদ। পকেট গেটের দিকে আসতেই ৮-১০ জন লোকের উপস্থিতি লক্ষ করি। রাতে এত লোকের উপস্থিতি অস্বাভাবিক ছিলো। একপর্যায়ে তারা আমার দিকে অগ্রসর হচ্ছিলেন। তখন পেছনে ফিরতেই দেখি আমার বন্ধু যায়িদ নেই।
তিনি বলেন, সামনেই আমার শ্যালিকার বাসা ছিলো। তখন ওই বাসার কেয়ারটেকার সেকান্দারকে ডেকে আনি। আর আমার লাইসেন্স করা অস্ত্র দেখিয়ে ওই লোকদের হাত উঁচু করতে বলি। তাদের একসঙ্গে জড়ো হতে বলে সামনে থাকা একটি মাইক্রোবাসের দিকে নেয়ার চেষ্ট করি। ওই সময় আরও চারটি মাইক্রো ঢোকে। ঘটনা আমি একা সামলাতে না পেরে দ্বিতীয় কেয়ারটেকার মুক্তারকে ডাকি। একপর্যায়ে তাকে মাইক্রোবাসের ছবি তুলতে বলি। ছবি তুলতে গেলে মুক্তারকে শকবাটনে আঘাত করে মাইক্রোবাসের ভেতরে নিয়ে যায় তারা। ওই সময় পেছনে থাকা গাড়ির লোকজন এসে আমার কোমরে আঘাত করে। একই সঙ্গে ৫-৭ জন ঝাপটে ধরেন। তখন তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি চলতে থাকে। কিছুক্ষণ পর পেছন থেকে আরেকটি মাইক্রোবাস এসে আমাকে জোর করে তুলে ফেলে।
হাসিনুর বলেন, মাইক্রোবাসে তুলে আমাকে হাতকড়া লাগিয়ে চোখে জমটুপি পরানো হয়। এরপর কালো কাপড় দিয়ে চোখ বেঁধে গাড়ি চালানো শুরু করে। ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর গাড়িটি থামে। এরপর গেট খোলার শব্দ শোনা যায়। তখন আমাকে ইচ্ছমতো মারধর করে অন্য পক্ষের কাছে হস্তান্তর করে তারা। এতে আমি নিস্তেজ হয়ে যাই। তারা আমাকে ধরাধরি করে একটি কক্ষে নিয়ে যায়। এরপর হাতকড়াসহ চোখের বাঁধন খুলে দেয়া হয়। ওই সময় সেখানে ৪ থেকে ৫ জন লোক দেখি। তারা আমাকে রেখে দরজা বন্ধ করে চলে যায়।
কক্ষের বিবরণ দিতে গিয়ে হাসিনুর বলেন, কক্ষটি ৮ থেকে ১০ ফুটের ছিলো। মেঝে স্যাঁতসেঁতে। হাইভোল্টেজের বাতি জ্বালানো থাকত সারাক্ষণ। কক্ষটি দেখতে নোংরা, ভয়াবহ ও বীভৎস ছিলো। রক্ত দিয়ে দেয়ালে লেখা ছিলো মোবাইল নম্বর। একটি চৌকি থাকলেও বিছানার চাদর ছিলো রক্তমাখা। প্রচণ্ড গরমে আমি অস্থির হয়ে যাই। আধা ঘণ্টা পর হাতকড়া পরিয়ে আগের মতো চোখ বেঁধে চড়-থাপ্পড় আর কিল-ঘুসি মারতে মারতে আরেকটি কক্ষে নিয়ে য়ায়। কক্ষটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিলো। সেখানে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে আমাকে একজন জিজ্ঞাসা শুরু করে। কথাবার্তা শুনে মনে হচ্ছিলো তিনি ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা। প্রথমত তিনি আমার ফেসবুক আইডি জানতে চান। মনে নেই বললে তিনি খেপে যান।
ওই সময় আমাকে জিজ্ঞেস করা হয় কেনো আমি সেনাপ্রধান আজিজের বিরুদ্ধে লেখালেখি করি। এজন্য আমাকে মেরে ফেলাসহ লাশ গুমের হুমকি দেন ওই কর্মকর্তা। একপর্যায়ে আমি কোথায় আছি জানতে চাওয়া হয়। জবাবে বলি ডিজিএফআই-এর সদর দফতরে আছি। তখন বলা হয়, কীভাবে বুঝতে পেরেছেন। এ সময় পাশ থেকে একজন বলছিলেন আপনি আয়নাঘরে আছেন। একটু পর আমাকে ইলেকট্রিক শকসহ মারধর শুরু করা হয়। সম্ভবত জিজ্ঞাসাবাদের লোক তখন ছিলো না। এরপর আবার মারধর করতে করতে আগের কক্ষে নিয়ে যায়। পরদিন একইভাবে নির্যাতন ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
হাসিনুর বলেন, দ্বিতীয় দিনের জিজ্ঞাসাবাদে আমাকে বলা হয়, ২০১৪ সালের নির্বাচন নিয়ে কেনো আমি কথা বলি। আওয়ামী লীগ ও ভারত সম্পর্কে কেনো নেতিবাচক লেখালেখি করি।
আমি জিজ্ঞাসা করি কী কারণে আমাকে তুলে আনা হয়েছে? তিনি বলেন, কী কারণে আনা হয়েছে, জানি না। তবে সরকারের নির্দেশে আনা হয়েছে। আপনি আমাদের সহযোগিতা করবেন। অধস্তনদের নির্দেশ মানবেন। একপর্যায়ে আমাকে বলা হয়, আপনার গ্রেফতারের জন্য কাকে-কাকে সন্দেহ করেন। জবাবে আমি বললাম, আমার বন্ধু যায়িদ, ব্রিগেডিয়ার আজহারসহ ডিজিএফআই ও র্যাব জড়িত। ব্রিগেডিয়ার আজহার তখন ডিজিএফআইতে কর্মরত ছিলেন।
ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর শাইখ মাহদীসহ অন্যরা।
মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেফতার রয়েছেন তিনজন। তারা হলেন ডিজিএফআই-এর সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। এদিন সকালে ঢাকার সেনানিবাসের বিশেষ কারাগার থেকে তাদের ট্রাইব্যুনালে আনে পুলিশ।
পলাতক ১০ আসামির পাঁচজনই বিভিন্ন মেয়াদে ডিজিএফআই-এর মহাপরিচালক (ডিজি) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এর মধ্যে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী ও মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
বাকি আসামিরা হলেন শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআই-এর সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।
সবার দেশ/কেএম




























