পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে আপিলে হাইকোর্টের রায় বহাল
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোট পুনর্বহাল
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান আবারও সংবিধানে ফিরে এসেছে। বহুল আলোচিত এ বিষয়ে হাইকোর্টের দেয়া রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগ সরকারের করা আপিল খারিজ করে দেয়ায় এ দুই সাংবিধানিক বিধান পুনর্বহাল হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করেন। এর মধ্য দিয়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণার হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত বহাল থাকলো।
রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রূহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, হাইকোর্ট যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল এবং পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা অবৈধ ঘোষণা করেছিলেন, আপিল বিভাগ সে রায় বহাল রেখেছেন। ফলে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হয়েছে।
রায়ের সময় রাষ্ট্রপক্ষে উপস্থিত ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রূহুল কুদ্দুস কাজল। রিটকারী সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর পক্ষে শুনানি করেন ড. শরীফ ভূঁইয়া এবং জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। রায় ঘোষণার পর দুই আইনজীবীই একে ‘ঐতিহাসিক’ বলে মন্তব্য করেন।
এর আগে গত ৮ জুলাই টানা তিন দিন শুনানি শেষে আপিল বিভাগ রায়ের জন্য ৯ জুলাই দিন ধার্য করেন। সে ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা হয়।
রায়ের প্রতিক্রিয়ায় আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহাল সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অংশ। তিনি জানান, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনেই অনুষ্ঠিত হবে। তবে ভবিষ্যতে সরকারের কাঠামো ‘তত্ত্বাবধায়ক’ নাকি ‘অন্তর্বর্তী’ হবে, সে বিষয়ে সব পক্ষের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাই সনদকে গুরুত্ব দিয়ে সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত বা পরিবর্তিত ৫৪টি বিষয়ে সংসদে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেয়া হবে। একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের রায় এবং জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী রায় বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়া হবে।
এর আগে গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলসহ পঞ্চদশ সংশোধনীর কয়েকটি ধারা অবৈধ ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল করা হয়। তবে আদালত পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করেননি। অবশিষ্ট বিষয়গুলো ভবিষ্যতে সংসদ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে সংশোধন, পরিমার্জন বা পরিবর্তন করতে পারবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে বলেছিলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তি। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক কয়েকটি জাতীয় নির্বাচনে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়েছে এবং এরই ধারাবাহিকতায় গণ-অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের মতে, জনগণের প্রত্যাশার ভিত্তিতেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত হয়েছিলো এবং এটি সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অংশে পরিণত হয়েছে।
রায়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত সংবিধানের ৭ক, ৭খ ও ৪৪(২) অনুচ্ছেদও বাতিল ঘোষণা করা হয়। পাশাপাশি গণভোট বাতিলসংক্রান্ত ৪৭ ধারাকে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী উল্লেখ করে তা বাতিল করা হয়। এর ফলে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদের অধীনে গণভোটের বিধান আবার কার্যকর হলো।
তবে আদালত স্পষ্ট করেন, পঞ্চদশ সংশোধনীর সব বিধান বাতিল হচ্ছে না। শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতিসহ সংশোধনীর অন্যান্য বিষয় ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ প্রয়োজন অনুযায়ী জনগণের মতামতের ভিত্তিতে পর্যালোচনা ও সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ৩০ জুন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় সংসদে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়, গণভোটের বিধান বাতিল করা হয় এবং সংবিধানের বিভিন্ন অনুচ্ছেদে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছিলো। সর্বশেষ আপিল বিভাগের এ রায়ের মাধ্যমে সে সংশোধনীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশের আইনগত ভিত্তি বাতিল হয়ে গেলো।
সবার দেশ/কেএম




























