ব্যালটে বদলের বার্তা
গণরায়ের ঐতিহাসিক প্রত্যাবর্তন
দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সংঘাত ও আস্থাহীনতার পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হলো এক উৎসবমুখর পরিবেশে। ফ্যাসিস্ট হাসিনা অধ্যায়ের অবসানের পর এ নির্বাচন ছিলো জনমতের এক বৃহৎ পরীক্ষাক্ষেত্র। বিচ্ছিন্ন দু’একটি অনিয়ম ও অভিযোগ ছাড়া সামগ্রিকভাবে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে—যা দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক।
এবারের নির্বাচনে ভোটারদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। বহু বছর পর ভোটকেন্দ্রে সাধারণ মানুষের ভিড় ছিলো প্রত্যাশারও বেশি। অংশ নিয়েছে এযাবতকালের অন্যতম সর্বাধিক রাজনৈতিক দল। গণভোটে জুলাই আন্দোলনের সংস্কার-অঙ্গীকারের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় দেখিয়েছে—রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নে জনগণ স্পষ্ট বার্তা দিতে চায়।
রাজনৈতিক ফলাফলের বিচারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) পেয়েছে নিরঙ্কুশ বিজয়। দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে এ ফলাফল কেবল সাংগঠনিক সক্ষমতার নয়, বরং দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের রাজনৈতিক প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া-র আদর্শিক রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের ধারাবাহিকতা নতুন বাস্তবতায় পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম তাদের আসন সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে এবং অধিকাংশ আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলে রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতার নতুন বার্তা দিয়েছে। অন্যদিকে, জুলাই আন্দোলনের তরুণ নেতৃত্বের হাত ধরে সদ্য গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ছয়টি আসনে জয়লাভ করে নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ করে দিয়েছে। এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত।
নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ভোট গণনা ও ফল ঘোষণাকে ঘিরে কিছু অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এসব অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত ও আইনসম্মত নিষ্পত্তি হওয়াই উচিত পথ। গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এখানেই—ভিন্নমত, বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্য দিয়েই এর পরিপক্বতা অর্জিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সহিংসতার পরিবর্তে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতরে থেকে সমাধানের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা।
এ নির্বাচনের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে সেনাবাহিনীর পেশাদার ভূমিকা। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পরিশ্রমও প্রশংসার দাবি রাখে। তাদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ভোটাররা নিরাপদ পরিবেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছেন।
আরও পড়ুন <<>> সেনাবাহিনীকে বিতর্কমুক্ত রাখাই রাষ্ট্রের স্বার্থ
তবে নির্বাচনই গণতন্ত্রের শেষ কথা নয়—এটি কেবল সূচনা। এখন প্রয়োজন প্রতিশ্রুত সংস্কার বাস্তবায়ন, জবাবদিহিমূলক শাসন, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করা। ‘ইনসাফের বাংলাদেশ’ কেবল স্লোগানে নয়, বাস্তব নীতিনির্ধারণ ও প্রশাসনিক আচরণে প্রতিফলিত হতে হবে।
অতএব, বিজয়ী ও পরাজিত—সব রাজনৈতিক শক্তির প্রতি আহ্বান, তারা যেনো প্রতিহিংসা নয়, সহযোগিতার রাজনীতি চর্চা করে। সংসদ হোক কার্যকর বিতর্কের মঞ্চ, রাজপথ নয় সংঘাতের অগ্নিপরীক্ষা। জনগণের রায়কে সম্মান জানিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ এখন আমাদের সামনে।
গণতন্ত্রের এ বিজয় যেন স্থায়ী হয়—এটাই সময়ের দাবি।
১৩ ফেব্রয়ারি ২০২৬
সম্পাদক




























