সাংবাদিক কর্মশালায় বক্তারা
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়নের তাগিদ
বাংলাদেশে রোগের তালিকায় শীর্ষে উচ্চ রক্তচাপ। এ রোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগে বছরে প্রায় ৫ লাখ ৭১ হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতে বর্ধিত বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের মতে, পরিকল্পিত অর্থায়ন, বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা ও মৃত্যু কমানো সম্ভব।
রোববার (১৮ অক্টোবর) রাজধানীর বিএমএ ভবনে ‘বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়ন: অগ্রগতি, বাধা এবং করণীয়’ শীর্ষক সাংবাদিক কর্মশালায় এ আহ্বান জানানো হয়। গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের সহযোগিতায় এ কর্মশালার আয়োজন করে। এতে সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কর্মরত ২৮ জন সাংবাদিক অংশ নেন।
কর্মশালায় জানানো হয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ। ২০২৪ সালে দেশে হৃদরোগে প্রায় ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর ৫২ শতাংশের জন্য উচ্চ রক্তচাপ দায়ী বলে কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্যে উল্লেখ করা হয়।
উদ্বেগের বিষয় হলো, শুধু বয়স্কদের মধ্যেই নয়, তরুণদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ বাড়ছে। ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে, ২০১৮’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর প্রায় ১২ শতাংশ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। ফলে অল্প বয়স থেকেই রোগটি শনাক্ত করা, নিয়মিত রক্তচাপ পরিমাপ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।

কর্মশালায় এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের উপমহাব্যবস্থাপক (বিক্রয় ও বিপণন) মো. রিয়াদ আরেফিন বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বর্ধিত বরাদ্দ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ব্যয় করা গেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
তিনি বলেন, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ওষুধের ব্যয় অনেক মানুষের জন্য চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই সরকারি অর্থায়নে প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা গেলে নিম্ন আয়ের মানুষও নিয়মিত চিকিৎসার সুযোগ পাবেন।
ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) সভাপতি দৌলত আকতার মালা বলেন, দেশে মোট মৃত্যুর ৭১ শতাংশ ঘটে অসংক্রামক রোগের কারণে। অথচ এসব রোগ মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ৪ দশমিক ২ শতাংশ বরাদ্দ রয়েছে। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তিনি মনে করেন, স্বাস্থ্য খাতে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি সে অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, কোন রোগের চিকিৎসা ও প্রতিরোধে কতটা গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ কতটা সেবা পাচ্ছেন, তা নিয়েও গণমাধ্যমের নিয়মিত অনুসন্ধান প্রয়োজন।
গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের বাংলাদেশ কান্ট্রি লিড মুহাম্মাদ রূহুল কুদ্দুস বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপে। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে টেকসই অর্থায়ন জরুরি। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও পর্যাপ্ত অর্থায়ন ছাড়া উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ, শনাক্তকরণ এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা কঠিন।
কর্মশালায় বক্তারা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সরকারি বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় রক্তচাপ পরীক্ষা সহজলভ্য করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি ও এর স্বাস্থ্যগত পরিণতি নিয়ে তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের মাধ্যমে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণে গণমাধ্যমকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তারা।
কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের। বিষয়ভিত্তিক উপস্থাপনা তুলে ধরেন প্রতিষ্ঠানটির প্রোগ্রাম অফিসার সামিহা বিনতে কামাল।
সবার দেশ/কেএম




























