নীরব ঘাতক উচ্চ রক্তচাপ: বাংলাদেশের অগ্রগতি, সংকট ও করণীয়
বিশ্বব্যাপী জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি এখন অসংক্রামক রোগ। উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস ও ক্যান্সারের মতো রোগে বিশ্বে প্রতি বছর চার কোটির বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যা মোট মৃত্যুর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ। এ মৃত্যুর ভার সবচেয়ে বেশি বহন করছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো। সে তালিকায় বাংলাদেশও আজ স্পষ্টভাবে যুক্ত।
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনকে নীরব ঘাতক বলা হয়—কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো উপসর্গ ছাড়াই এটি শরীরের ভেতরে ধীরে ধীরে প্রাণঘাতী ক্ষতি করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ৩০–৭৯ বছর বয়সী প্রায় ১৪০ কোটি মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। এর বড় অংশই বসবাস করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। প্রতিবছর এক কোটিরও বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে শুধু এ একটি ঝুঁকির কারণে—যা সব সংক্রামক রোগে মোট মৃত্যুর চেয়েও বেশি।

বাংলাদেশের চিত্র আরও উদ্বেগজনক। ‘বাংলাদেশ এনসিডি স্টেপস সার্ভে ২০২২’ বলছে, দেশের প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের একজন উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ এখন দেশের শীর্ষ রোগের তালিকায় এক নম্বরে। অথচ আক্রান্তদের অর্ধেকের বেশি জানেনই না যে তারা এ রোগে ভুগছেন। যারা জানেন, তাদেরও বড় অংশ নিয়মিত চিকিৎসা বা ওষুধ গ্রহণ করছেন না। ফলাফল হিসেবে হৃদরোগ, স্ট্রোক ও কিডনি বিকলের মতো ব্যয়বহুল ও প্রাণঘাতী রোগ বাড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২৫ সালের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের মধ্যে মাত্র ১৬ শতাংশের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অর্থাৎ প্রতি সাতজন রোগীর মাত্র একজন নিয়মিত চিকিৎসার সুফল পাচ্ছেন। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে দেশে হৃদরোগজনিত মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী।

তবে এ অন্ধকার চিত্রের মাঝেও কিছু আশার আলো আছে। সরকার গত কয়েক বছরে উচ্চ রক্তচাপসহ অসংক্রামক রোগ মোকাবেলায় নীতিগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের ওষুধ তালিকায় উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত, জাতীয় গাইডলাইন ও চিকিৎসা প্রোটোকল প্রণয়ন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এনসিডি কর্নার স্থাপন—এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। বর্তমানে দেশের ৪৩০টি স্বাস্থ্য কেন্দ্রে এনসিডি কর্নার চালু রয়েছে, যেখানে উচ্চ রক্তচাপ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা সেবা দেয়া হচ্ছে। সঠিকভাবে সম্প্রসারণ করা গেলে এ মডেল গ্রাম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বড় সুরক্ষা বলয় গড়ে তুলতে পারে।

কিন্তু বাস্তবতার দেয়ালে এসব উদ্যোগ বারবার ধাক্কা খাচ্ছে। সবচেয়ে বড় বাধা টেকসই অর্থায়নের অভাব। কমিউনিটি ক্লিনিক ও এনসিডি কর্নারে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের সিদ্ধান্ত থাকলেও অর্থ ও সরবরাহ সংকটে তা নিয়মিত বাস্তবায়ন হচ্ছে না। অনেক জায়গায় মাসের পর মাস উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ পাওয়া যায় না। ফলে দরিদ্র ও শ্রমজীবী মানুষ বাধ্য হয়ে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন, যা দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্য বাজেটের দীর্ঘস্থায়ী সংকট। জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ এখনও মোট বাজেটের প্রায় পাঁচ শতাংশের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের তুলনায় অনেক কম। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বরাদ্দকৃত অর্থের বড় অংশই সময়মতো খরচ হয় না। প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়নকে কার্যত স্থবির করে রাখছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বহনের প্রধান ভার এখনও সাধারণ মানুষের নিজের পকেটে। মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই ব্যক্তিগত ব্যয়। দীর্ঘমেয়াদি রোগ হিসেবে উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে এ বাস্তবতা সবচেয়ে ক্ষতিকর। নিয়মিত ওষুধ কেনা অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয় না, ফলে রোগ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
এ পরিস্থিতিতে করণীয় স্পষ্ট। প্রথমত, উচ্চ রক্তচাপকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে হবে। দেশের সব কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত ও বিনামূল্যে উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ওষুধ উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সমন্বয় জোরদার করতে হবে, যাতে কোনো পর্যায়ে ঘাটতি না দেখা দেয়। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।

গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে প্রতি এক টাকা বিনিয়োগ করলে সমাজ ও অর্থনীতিতে প্রায় ১৮ টাকার সমপরিমাণ সুফল পাওয়া যায়। অর্থাৎ এটি কেবল স্বাস্থ্য খাতের ব্যয় নয়, বরং একটি লাভজনক সামাজিক বিনিয়োগ।
উচ্চ রক্তচাপের নীরব মহামারি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগজনিত অকাল মৃত্যু এক-তৃতীয়াংশে কমানোর টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু এখনই যদি দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার, পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এ নীরব ঘাতককে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থতার জন্য উচ্চ রক্তচাপ মোকাবিলা এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি সময়ের দাবি।
লেখক ও সংবাদকর্মী




























