গার্ডিয়ানের রিপোর্ট
বদলে যাচ্ছে যুদ্ধের সমীকরণ, নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে!
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের শুরুতে সামরিক উদ্যোগের নিয়ন্ত্রণ ছিলো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতেই। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছে, ততই বদলে যাচ্ছে সে দৃশ্যপট। বিভিন্ন সামরিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ধীরে ধীরে যুদ্ধের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ইরানের দিকেই সরে যেতে শুরু করেছে।
ইরানের প্রভাবশালী সামরিক সংস্থা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস–এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ী সম্প্রতি বলেছেন, এ যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতেই থাকবে। তিনি উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার এবং হামলায় হওয়া ক্ষতির ক্ষতিপূরণ দেয়ার আহ্বানও জানান। কয়েক সপ্তাহ আগেও তেহরানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের কণ্ঠে এমন আত্মবিশ্বাস খুব একটা শোনা যায়নি।
সংঘাতের সূচনা হয় ইসরাইলের আকস্মিক হামলার মধ্য দিয়ে। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান দ্রুত ইরানের আকাশসীমায় অভিযান চালিয়ে তাদের সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করে। গভীর গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তারা ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় হাজারো হামলা চালায়।
এর জবাবে ইরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে। যদিও বেশিরভাগ হামলাই ইসরায়েলের শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিহত হয়। তবুও এসব হামলায় ইসরায়েলে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন।
উপসাগরীয় দেশগুলোতেও ইরান হামলার চেষ্টা চালিয়েছে, তবে সেসব হামলার বেশিরভাগই বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই প্রতিহত করা গেছে। তবুও ওই অঞ্চলে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে এবং শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোর ভাবমূর্তি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে সংঘাতের বড় মোড় আসে যখন কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যায়। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস পরিবহনের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ এ সমুদ্রপথ দিয়ে যায়। ফলে প্রণালিটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করে এবং জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার বলেছেন, ইরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করার পরই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটবে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এমন এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ছে যা শুরুতে তারা প্রত্যাশা করেনি।
অন্যদিকে হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেম–এর সামরিক ইতিহাসের অধ্যাপক ড্যানি অরবাখ মনে করেন, যুদ্ধের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হাতেই রয়েছে। তার মতে, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণে থাকা মানে এজেন্ডা নির্ধারণের ক্ষমতা ধরে রাখা। তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা কমে আসছে, তাই সংঘাতকে বিস্তৃত করার কৌশল নিয়েছে তেহরান।
অন্যদিকে কিংস কলেজ লন্ডন–এর নিরাপত্তা অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক পিটার নিউম্যান ভিন্ন মত দিয়েছেন। তার মতে, দুর্বল অবস্থান থেকেও ইরান পরিস্থিতিকে নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধের কার্যকর জবাব খুঁজতে যুক্তরাষ্ট্র এখনও হিমশিম খাচ্ছে এবং এ মুহূর্তে যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ অনেকটাই ইরানের হাতে চলে গেছে।
প্রণালিটি পুনরায় খুলতে যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশগুলোকে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান জানিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনও দেশ তাতে সাড়া দেয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, শত শত তেলবাহী জাহাজকে নিরাপত্তা দিতে বিপুল সামরিক শক্তি প্রয়োজন হবে, তবুও পুরো নৌপথ সুরক্ষিত রাখা কঠিন। একটি ক্ষেপণাস্ত্র, একটি সামুদ্রিক মাইন বা বিস্ফোরকভর্তি ছোট নৌযানও বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এদিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। তারা ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালালে এর জবাবে ইসরায়েল ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। এতে ৮০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ৮ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ–এর লেবানন বিশ্লেষক ডেভিড উড বলেন, হিজবুল্লাহর প্রধান লক্ষ্য টিকে থাকা, আর ইসরায়েলের লক্ষ্য তাদের সম্পূর্ণভাবে নির্মূল করা।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের এ সংঘাত কেবল আঞ্চলিক সংকটেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
সূত্র: গার্ডিয়ান
সবার দেশ/কেএম




























