Sobar Desh | সবার দেশ আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪:৪৩, ১৪ মার্চ ২০২৬

ইরান যুদ্ধে বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র— পালানোর খুঁজছেন ট্রাম্প

ইরান যুদ্ধে বিপাকে যুক্তরাষ্ট্র— পালানোর খুঁজছেন ট্রাম্প
ফাইল ছবি

মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হলেও দেশটির সরকার ভেঙে পড়েনি। বরং হরমুজ প্রণালিতে কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করে ইরান এখন পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে কঠিন সমীকরণের মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চলা তীব্র বিমান হামলার পর পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে ইরান বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের বাধা তৈরি করছে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপরও হামলা জোরদার করেছে তেহরান। এতে দীর্ঘদিনের স্থিতিশীলতার জন্য পরিচিত উপসাগরীয় অঞ্চলও এখন অস্থিরতার মুখে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিন তেহরানের আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠেছিলো। সে হামলায় রাজধানীর একটি আবাসিক এলাকায় লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। এতে ইরানের নেতৃত্ব কাঠামো বড় ধাক্কা খেলেও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি।

যুক্তরাষ্ট্রের অধ্যাপক রবার্ট পেপ তার বই ‘বোম্বিং টু উইন’-এ উল্লেখ করেছেন, রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র সংঘাতে কেবল নেতৃত্বকে টার্গেট করে হামলা চালিয়ে কোনও সরকারকে সহজে পরাজিত করা যায় না। ইরানের ক্ষেত্রেও সে বাস্তবতাই সামনে এসেছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সম্প্রতি বলেছেন, গত দুই দশকে পূর্ব ও পশ্চিমের প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক অভিযানের পরিণতি ইরান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছে এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়েছে।

খামেনির মৃত্যুর পর দ্রুতই নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ দেয় তেহরান। পাশাপাশি দেশটির বিকেন্দ্রীভূত ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ কৌশলের কারণে সামরিক কমান্ড কাঠামোও ভেঙে পড়েনি।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ বলেন, শীর্ষ নেতৃত্বের কিছু ক্ষতি হলেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনও যথেষ্ট শক্ত অবস্থানে রয়েছে।

তার মতে, তেহরান বর্তমানে তিনটি স্তরের কৌশল অনুসরণ করছে— প্রথমত রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকা, দ্বিতীয়ত পাল্টা হামলার সক্ষমতা ধরে রাখা এবং তৃতীয়ত যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা যাতে নিজেদের শর্তে সংঘাতের সমাপ্তি টানা যায়।

এ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম দ্রুত বাড়ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

ইরান ইতোমধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ও স্বল্পমূল্যের ড্রোন ব্যবহার করে দুবাইয়ের মেরিনা এলাকা এবং সাগরে থাকা তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোর ওপর হামলা চালিয়েছে। ফলে সংঘাত এখন তুরস্ক, সাইপ্রাস ও উপসাগরীয় অঞ্চলেও প্রভাব ফেলছে।

লেবাননে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের পাল্টাপাল্টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে হরমুজ প্রণালী ঘিরে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ প্রায় বন্ধ করে দেয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে।

এর প্রভাব পড়েছে বিশ্বের নানা দেশে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার মতো দেশগুলোতে জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। কিছু দেশে তেলের রেশনিং চালু করা হয়েছে। বিমান চলাচল ব্যাহত হয়েছে এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিদেশিরা দ্রুত সরে যেতে শুরু করেছেন।

তেল আমদানিকারক দেশগুলো জরুরি মজুদ থেকে প্রায় ৪০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি বাজারে ছাড়লেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি।

বিশ্ব বাণিজ্যেও এর প্রভাব পড়েছে। কেনিয়ার চা ব্যবসায়ীরা পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়া এবং জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচ বেড়ে যাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাদের গুদামে বিপুল পরিমাণ চা অবিক্রীত অবস্থায় পড়ে আছে।

গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের সৌদি বিশ্লেষক আজিজ আলগাশিয়ান বলেন, অনেকেই আগে থেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে এ সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলার দরজা খুলে দিতে পারে।

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ড্যানি সিট্রিনোভিজ মনে করেন, সামরিক শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও ইরানের কৌশলগত চিন্তাধারা সম্পর্কে যথেষ্ট বোঝাপড়া তৈরি করতে পারেনি ইসরায়েল ও তার মিত্ররা।

কানাডার লাভাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোনাথন প্যাকুইন বলেন, ওয়াশিংটন হয়তো অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে ভুগেছিলো এবং ভেবেছিল তাদের হাতে সব কৌশলগত সুবিধা রয়েছে।

এ আত্মবিশ্বাসের পেছনে ছিলো বছরের শুরুতে ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোর সরকারকে মার্কিন অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনা এবং ইরানে আগে থেকে চলা বিক্ষোভ।

এখন পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নিয়েছে। ইরান বিশ্ব অর্থনীতিকে চাপে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়বহুল পেট্রিয়ট ও থাড প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুদও দ্রুত কমে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে ট্রাম্পের ওপর। সামনে কংগ্রেস নির্বাচন থাকায় জ্বালানির দাম নিয়ে ক্ষুব্ধ ভোটারদের প্রতিক্রিয়া রিপাবলিকানদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। অনেক প্রতিনিধি ও সিনেটর হোয়াইট হাউসে ফোন করে নিজেদের আসন হারানোর আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন।

তবে দীর্ঘমেয়াদে ইরানও সংকটের বাইরে নয়। ফ্রান্সভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইএফআরআইয়ের গবেষক ক্লেমেন্ট থার্মে মনে করেন, দেশটি ধীরে ধীরে একটি ‘জম্বি স্টেট’-এ পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে সরকার টিকে থাকলেও অর্থনৈতিক সংকট এত গভীর হতে পারে যে রাষ্ট্র পরিচালনা কঠিন হয়ে উঠবে।

তবুও আপাতত সহজ কোনও সমাধান সামনে নেই। বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে ট্রাম্প হয়তো তার ‘বিজয়’ ঘোষণার সংজ্ঞা পরিবর্তন করার চেষ্টা করতে পারেন। শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য থেকে সরে এসে তিনি হয়তো দাবি করবেন যে খামেনিকে হত্যা করাই ছিলো এ অভিযানের প্রধান সাফল্য। এতে হয়তো তার যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসার পথ সুগম হবে।

তবে আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক নেট সোয়ানসনের মতে, ইরান সম্ভবত এত সহজে যুক্তরাষ্ট্রকে এ সংঘাত থেকে বের হওয়ার সুযোগ দেবে না।

এ প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের সামনে দুটি কঠিন পথ খোলা থাকতে পারে— সরাসরি স্থলবাহিনী নামিয়ে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া অথবা ইরানের ভেতরের বিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে দেশটিতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা সৃষ্টি করা।

এদিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাল্টাপাল্টি লড়াই চলছেই, যার প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ছে।

সবার দেশ/কেএম

শীর্ষ সংবাদ:

শ্রীলঙ্কাকে টপকে টি-টোয়েন্টি র‍্যাঙ্কিংয়ে আটে বাংলাদেশ
বীরগঞ্জে জমি দখলের অভিযোগ, প্রবাসী পরিবারের আর্তনাদ
রাতেও বাড়ছে মেট্রোরেলের সময়, কমছে ট্রেনের ব্যবধান
বাংলাদেশে ক্যাম্পাস খুলতে চায় ইউনিভার্সিটি অব ক্যানবেরা
পশ্চিমবঙ্গে ‘পুশ ইন’ হলে ব্যবস্থা নেবে বাংলাদেশ: পররাষ্ট্রমন্ত্রী
কোরবানির চামড়া ব্যবস্থাপনায় নতুন সিদ্ধান্ত
৪৮ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতি ঘোষণা রাশিয়ার
বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতে আতঙ্কের কারণ নেই: বাণিজ্যমন্ত্রী
পিএসসিতে নিয়োগ, আবেদন শেষ ১১ মে
ঈদের ‘মালিক’-এ চমক, মিলা–প্রতীকের ‘গুলগুলি পিঠা’
কমলো সোনার দাম
‘শাপলা গণহত্যা’র নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন চান জামায়াত আমির
এমপি হলেন নুসরাত তাবাসসুম, গেজেট প্রকাশ
ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’কে ‘প্রজেক্ট ডেডলক’ বললো ইরান
‘শাপলা গণহত্যা’ দিবস আজ
চীনে কারখানায় বিস্ফোরণে নিহত ২১, আহত অর্ধশতাধিক
সীমান্তে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে সর্বোচ্চ সতর্কতায় বিজিবি
গণহত্যায় হাসিনাসহ সব অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করতে হবে