স্থলযুদ্ধে হুঁশিয়ারি তেহরানের
মার্কিন সেনাদের সঙ্গে রক্তের সমুদ্রে লড়াইয়ের প্রস্তুতি ইরানের
ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য মার্কিন স্থল অভিযানের প্রেক্ষাপটে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি স্থল হামলায় নামে, তবে সেটি হবে দীর্ঘ, ব্যয়বহুল এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাত।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানে স্থল অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলো দখলে নেয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সামরিকভাবে অত্যন্ত জটিল।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ন্ত্রণে নেয়ার নির্দেশ দেন, তবে মার্কিন বাহিনীকে ইরানের অভ্যন্তরে গভীরভাবে প্রবেশ করতে হবে। এতে একাধিক সুরক্ষিত স্থাপনা দখল, সরবরাহ বজায় রাখা এবং নিরাপদে ফিরে আসা—সবই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন অ্যাডমিরাল জেমস স্ট্যাভরিডিস এ ধরনের অভিযানের জন্য ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশেষ বাহিনীর অপারেশন’ প্রয়োজন হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন।
ইরানের ভৌগোলিক বাস্তবতাও এ যুদ্ধকে আরও জটিল করে তুলেছে। জাগ্রোস পর্বতমালা দেশটির পশ্চিমাংশে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা প্রাচীর হিসেবে কাজ করছে, যা উপকূল থেকে ভেতরে অগ্রসর হওয়াকে কঠিন করে তোলে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো উপসাগরীয় মার্কিন ঘাঁটি থেকে প্রায় ৬০০ মাইল দূরে অবস্থিত।
সামরিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ইরান বহুস্তর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা থেকে শুরু করে মোবাইল ইউনিট এবং পোর্টেবল ক্ষেপণাস্ত্র—সব মিলিয়ে একটি জটিল প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। এ ব্যবস্থার বড় অংশ পরিচালনা করে ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি), যারা দীর্ঘদিন ধরে অসম যুদ্ধ কৌশলে দক্ষতা অর্জন করেছে।
ইরানের দাবি অনুযায়ী, তাদের প্রতিরক্ষায় প্রায় ১০ লাখ যোদ্ধা প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত বাহিনীর পাশাপাশি বাসিজ মিলিশিয়া ও স্বেচ্ছাসেবকও রয়েছে। যদিও এ সংখ্যার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে, তবে যেকোনও আক্রমণকারী বাহিনীর জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ইরানের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসহাক জাহাঙ্গিরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থলপথে ইরানে প্রবেশ করে, তবে তাদের ‘রক্তের সাগর’ পাড়ি দিতে হবে। অর্থাৎ প্রতিটি ইঞ্চি ভূমির জন্য কঠিন প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হবে।
অভিযানের আরেকটি জটিল দিক হচ্ছে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ। প্রায় ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়াম নিরাপদে সংগ্রহ ও পরিবহন করতে বিশেষ প্রযুক্তি ও দক্ষতা প্রয়োজন। ইরানের দাবি, এসব উপাদান বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে—কিছু গ্যাসীয়, কিছু ধাতব বা পাউডার আকারে, এমনকি ধ্বংসস্তূপের নিচেও থাকতে পারে।
একইসঙ্গে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালালে তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটি, উপসাগরীয় অবকাঠামো এবং গুরুত্বপূর্ণ জলপথ যেমন হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের অভিযান অতীতের ব্যর্থ মার্কিন সামরিক অভিযানের স্মৃতিও ফিরিয়ে আনতে পারে। ১৯৮০ সালে তেহরানে জিম্মি উদ্ধারের ব্যর্থ প্রচেষ্টা তার একটি উদাহরণ, যেখানে সীমিত আকারের অপারেশনও বিপর্যয়ে শেষ হয়েছিলো।
সব মিলিয়ে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্ভাব্য স্থলযুদ্ধ এখন শুধু সামরিক শক্তির নয়, বরং কৌশল, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহনশীলতার লড়াইয়ে রূপ নিচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের ধারণা, সরাসরি স্থল সংঘাতে জড়ালে যুক্তরাষ্ট্রকে বড় ধরনের মূল্য দিতে হতে পারে, আর সে সুযোগে ইরান প্রতিরোধকে দীর্ঘায়িত করতে পারে।
সবার দেশ/কেএম




























