গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো বাড়িঘর
ভারতে ১১০০ মুসলিম পরিবার উচ্ছেদ, ভাঙা হলো মসজিদও
ভারতের আসামে বনভূমি দখলমুক্ত করার অভিযানে দুই দিনে এক হাজার ১০০টির বেশি মুসলিম পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়েছে। এ সময় তাদের ঘরবাড়িসহ ১০টির বেশি মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার ও রোববার রাজ্যটির নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাট জেলায় এ অভিযান চালানো হয়। উচ্ছেদ অভিযানে বাঙালি মুসলমানদের বিশেষভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সংখ্যালঘুদের একটি সংগঠন। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, বনভূমি থেকে অবৈধ দখলদারদের সরাতেই এ অভিযান চালানো হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুই দিনের অভিযানে আসামের তিন জেলায় অন্তত ৬০০ হেক্টর বনভূমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে রোববার (১৮ অক্টোবর) নগাঁও জেলার লুটুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ৬০০টির বেশি মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়া হয়। বনভূমি দখল করে এসব পরিবার বসতি গড়ে তুলেছিল বলে দাবি করেছে রাজ্য প্রশাসন।
বন বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা স্ক্রলকে জানান, উচ্ছেদ অভিযানের দ্বিতীয় দিনে লুটুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বড় পরিসরে অভিযান চালানো হয়। এদিন প্রায় ৩১৪ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। মোট ৫৬৩টি পরিবারকে ওই এলাকা থেকে উচ্ছেদ করা হয়।
এর আগের দিন শনিবার (১৭ অক্টোবর) নগাঁও, গোলাঘাট ও হোজাই জেলায় ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। এর মধ্যে নগাঁওয়ে ৩৩৬টি, গোলাঘাটে ৫৯টি এবং হোজাইয়ে ১৫২টি পরিবার রয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উচ্ছেদের শিকার পরিবারগুলোর অধিকাংশই বাঙালি মুসলিম।
সব মিলিয়ে দুই দিনের অভিযানে এক হাজার ১০০টির বেশি পরিবার উচ্ছেদের মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
৫০ বছর ধরে বসবাস, পুনর্বাসনের দাবি
লুটুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের বাসিন্দা ৪৪ বছর বয়সী আবদুল নূর দাবি করেছেন, ওই এলাকায় বসবাসকারী অনেক পরিবারকে কয়েক দশক আগে সরকারই পুনর্বাসন করেছিলো।
স্ক্রলকে তিনি বলেন, ১৯৭৪ সালে সরকার তাদের সেখানে পুনর্বাসন করে। তারা মূলত কাছের জুরিয়া শহরের বাসিন্দা ছিলেন। পূর্বপুরুষেরা ভূমিহীন হওয়ায় সরকার তাদের বসবাসের জন্য জমি দিয়েছিলো। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০ ভূমিহীন পরিবারকে চার বিঘা করে জমি বরাদ্দ দেয়া হয়েছিলো বলে দাবি করেন তিনি।
আবদুল নূর আরও বলেন, উচ্ছেদের বিরুদ্ধে তারা গৌহাটি হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন। তবে আদালত থেকে তারা কোনও প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার দাবি, উচ্ছেদ অভিযানে ৫০ বছরের বেশি পুরোনো কয়েকটি মসজিদসহ ১০টিরও বেশি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। বন বিভাগের শ্রমিক হিসেবে কাজ করার কারণে তাদের অনেককে ওই এলাকায় বসবাসের জন্য নিয়ে আসা হয়েছিলো বলেও জানান তিনি।
প্রশাসনের দাবি, আদালতের নির্দেশে উচ্ছেদ
বন বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত আগস্টে মাইকিং করে উচ্ছেদ অভিযানের বিষয়ে বাসিন্দাদের জানানো হয়েছিলো। এরপর প্রায় ৯০ শতাংশ দখলদার নিজেরাই এলাকা ছেড়ে চলে যান। আদালতের নির্দেশনা অনুসরণ করেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে প্রশাসন।
তবে অভিযানের পদ্ধতি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে অল আসাম মাইনরিটিজ স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এএএমএসইউ)। সংগঠনটির অভিযোগ, বনভূমি দখলমুক্ত করার নামে ওই এলাকার মুসলিম পরিবারগুলোকে বৈষম্যমূলকভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে।
সংগঠনটির দাবি, রোববারের অভিযানে পাঁচটি মসজিদসহ প্রায় এক হাজার ৬৬৯টি স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
এএএমএসইউর সভাপতি এমডি ইমতিয়াজ হুসেইন জানান, লুটুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদের মুখে পড়া ৫০০টির বেশি পরিবারের মধ্যে প্রায় ৩০০টি পরিবারকে ১৯৭৩ সালে সরকার সেখানে পুনর্বাসন করেছিলো। ওই পরিবারগুলোর মধ্যে ১৭৭টি ছিল মুসলিম পরিবার বলে দাবি করেন তিনি।
ইমতিয়াজ হুসেইন বলেন, বনাঞ্চল থেকে উচ্ছেদের বিষয়ে ২০ জুলাইয়ের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল। তবে তার অভিযোগ,
রোববার ১৭৭টি মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হলেও অমুসলিমদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদপ্রক্রিয়া শুরু করা হয়নি। তাদের কোনও নোটিশও দেয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
পুনর্বাসন ও বৈষম্যের অভিযোগ ঘিরে উদ্বেগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে প্রায় ৩০০ পরিবারকে লুটুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে অস্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা হয়েছিলো। বর্তমানে তাদের বসতি উচ্ছেদের ঘটনায় পুরোনো পুনর্বাসন নীতি, জমির অধিকার এবং সংখ্যালঘু পরিবারগুলোর প্রতি প্রশাসনের আচরণ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
একদিকে রাজ্য প্রশাসন বনভূমি দখলমুক্ত করার কথা বলছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলোর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করে আসা মানুষের ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় স্থাপনা ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয়েছে। বিশেষ করে কয়েক দশক আগে সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসিত পরিবারগুলোর বর্তমান অবস্থান এবং তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র: স্ক্রল।
সবার দেশ/কেএম




























