আকাশে যুদ্ধবিমানের গর্জন
ভেনেজুয়েলার প্রধান সামরিক ঘাঁটির কাছে একাধিক বিস্ফোরণ
লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। শনিবার (৩ জানুয়ারি) ভোরের দিকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিকট শব্দ শোনা যায় এবং আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা যায়। কারাকাসে অবস্থানরত আল–জাজিরার প্রতিনিধি বিস্ফোরণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যেই এ ঘটনা ঘটায় নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বিস্ফোরণগুলো রাজধানীর প্রধান সামরিক ঘাঁটি ফরচুনা অথবা এর আশপাশে ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, শনিবার ভোরে কারাকাসের বাসিন্দারা একের পর এক প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পান। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণের শব্দে শহর কেঁপে ওঠে।
এদিকে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, কারাকাসে অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। একই সঙ্গে শহরের নিচ দিয়ে যুদ্ধবিমান উড়ে যাওয়ার আওয়াজ পাওয়া গেছে। রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত একটি বড় সামরিক ঘাঁটির আশপাশে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, ফলে পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়।
আল–জাজিরার হাতে আসা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, শনিবার ভোরে কারাকাসের একটি জলাধারের পাশে অবস্থিত একটি স্থাপনা থেকে আগুনের গোলা ও ঘন কালো ধোঁয়া আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। চিলির সান্তিয়াগো থেকে পাঠানো এক প্রতিবেদনে আল–জাজিরার সাংবাদিক লুসিয়া নিউম্যান বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানান, বিস্ফোরণটি কারাকাসের প্রধান সামরিক ঘাঁটি ফরচুনা বা তার কাছাকাছি এলাকায় ঘটেছে।
নিউম্যান বলেন, ফরচুনা ভেনেজুয়েলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সামরিক স্থাপনা। ওই এলাকায় একের পর এক বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং এর পরপরই বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পুরো এলাকায় ব্ল্যাকআউট নেমে আসে।
তিনি আরও জানান, এ ঘটনার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কোনও ধরনের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে—এমন একটি অনুমান করা হচ্ছে। তবে কীভাবে বিস্ফোরণ ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি। নিউম্যানের মতে, অভ্যন্তরীণ নাশকতার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না। সামরিক বাহিনীর ভেতরে এমন কোনো পক্ষ থাকতে পারে, যারা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে এবং তারাই এ হামলার সঙ্গে জড়িত হতে পারে।
এ ঘটনার পটভূমিতে ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সম্প্রতি মাদক পাচার রোধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলো ভেনেজুয়েলা। প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো নিজেই এ তথ্য জানান। তবে গত সপ্তাহে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর নেতৃত্বে ভেনেজুয়েলায় হামলার যে খবর ছড়িয়ে পড়ে, সে বিষয়ে তিনি প্রকাশ্যে কোনও মন্তব্য করেননি।
গত বৃহস্পতিবার প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে মাদুরোর এ বক্তব্য সামনে আসে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তুলনামূলক নমনীয় সুরেই কথা বলছিলেন তিনি। তবে আগের অভিযোগ আবারও তুলে ধরে মাদুরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তার সরকার উৎখাত করে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল ভান্ডারের দখল নিতে চায়।
মাদুরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের যদি তেল প্রয়োজন হয়, তবে ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে, যেমনটি করছে শেভরন। উল্লেখ্য, এ মার্কিন তেল কোম্পানিটি বর্তমানে ভেনেজুয়েলা থেকে অপরিশোধিত তেল রফতানির অনুমতি পেয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে মাদুরো বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, এসব নিয়ে কয়েক দিন পর কথা বলা যেতে পারে।
মাদুরোর দাবি, ট্রাম্প প্রশাসনের মনোভাব থেকেই স্পষ্ট যে যুক্তরাষ্ট্র ভয় দেখিয়ে বা শক্তি প্রয়োগ করে ভেনেজুয়েলার ওপর নিজেদের আধিপত্য চাপিয়ে দিতে চায়। এ সাক্ষাৎকারটি ধারণ করা হয়েছিলো ইংরেজি বছরের শেষ দিনে। ঠিক সে দিনই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী মাদক পাচারের অভিযোগে পাঁচটি নৌকায় হামলা চালিয়ে অন্তত পাঁচজনকে হত্যা করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এ পর্যন্ত মোট ৩৫টি নৌকায় হামলা চালানো হয়েছে। এসব অভিযানে অন্তত ১১৫ জন নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার নাগরিকরাও রয়েছেন।
কারাকাসে বিস্ফোরণের এ ঘটনায় এখনও পর্যন্ত সরকারিভাবে বিস্তারিত কোনও বিবৃতি দেয়া হয়নি। তবে পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা হচ্ছে এবং রাজধানীতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সূত্র।
সবার দেশ/কেএম




























