চট্টগ্রাম-কক্সবাজারে মানুষ পানিবন্দি, পাহাড়ধসের উচ্চঝুঁকি
বন্যার ভয়াবহতা বাড়ছে, এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত
টানা ভারী বৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং সমুদ্রের অস্বাভাবিক জোয়ারে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার। দুই জেলায় প্রায় ১২ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, বহু এলাকা বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছে। দুর্গত এলাকায় সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে, বন্যা পরিস্থিতির কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীন এইচএসসি, আলিম, এইচএসসি (ভোকেশনাল) ও ডিপ্লোমা ইন কমার্সের ১৪, ১৫ ও ১৬ জুলাইয়ের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতর বন্যা মোকাবিলায় সাত দফা জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তথ্যমতে, জেলার ১৬টি উপজেলার ১৭৬টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা বন্যাকবলিত হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত এবং পানিবন্দি মানুষের সংখ্যা সাড়ে সাত লাখ ছাড়িয়েছে। তবে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের হিসাবে সাতটি উপজেলায়ই ১০ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন।
বাঁশখালী, সাতকানিয়া, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, সন্দ্বীপ, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারীতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ গ্রামীণ সড়ক পানির নিচে চলে যাওয়ায় অনেক এলাকায় এখনও ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, পানির প্রবল স্রোতের কারণে সাধারণ নৌযান দিয়ে দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো যাচ্ছে না। এ কারণে সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ড স্পিডবোট ব্যবহার করে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। জেলার ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় ২৪ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন।
বন্যায় চট্টগ্রামে গত পাঁচ দিনে পাহাড়ধস, দেয়ালধস ও পানিতে ডুবে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাতকানিয়ায় পানিতে ডুবে দুই বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া রাঙ্গুনিয়ায় পাহাড়ি ঢলের তোড়ে একটি বেইলি সেতু ধসে পড়ে রাঙ্গুনিয়া-বান্দরবান সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং এলজিইডির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, জেলার প্রায় ২৯৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ১৭৬টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজারেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৬৯টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে এবং এখনো প্রায় আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। গত সাত দিনে রেকর্ড ৭২০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও নিরাপদ আশ্রয়ের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
গত ৫ জুলাই থেকে শনিবার পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানি ও পাহাড়ধসে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। রামুর চাইন্দা এলাকায় কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের প্রায় তিন কিলোমিটার অংশ পানির নিচে থাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী দুই দিনও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে নতুন করে পাহাড়ধস ও বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।
রাঙামাটির নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানিতে ফসলি জমি, গোলাভরা ধান ও গবাদিপশুর খামার ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, বরকল ও রাজস্থলী উপজেলায় কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। রাজস্থলীতে বন্যার পানিতে ডুবে আটটি গরুর মৃত্যু হয়েছে।
বান্দরবান জেলা শহর আবারও প্লাবিত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের একটি সাবস্টেশনের ট্রান্সফরমার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিকল্প ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখা হয়েছে।
হবিগঞ্জে উজানের ঢল ও টানা বৃষ্টিতে নতুন করে আরও অন্তত ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এতে লক্ষাধিক মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি পানির নিচে চলে গেছে। বিশুদ্ধ পানির সংকটও তীব্র হয়েছে।
নোয়াখালী ও হাতিয়ায় টানা বর্ষণে ব্যাপক জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে সাতক্ষীরার ছয়টি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে মৎস্যঘের, পুকুর ও কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
দুর্গত মানুষের সহায়তায় বাংলাদেশ নৌবাহিনীও মাঠে নেমেছে। আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নৌবাহিনীর সদস্যরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পানিবন্দি মানুষের মধ্যে দুই হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করেছেন। স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে না আসা পর্যন্ত এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে নৌবাহিনী।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বন্যাকবলিত এলাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সাত দফা জরুরি নির্দেশনা দিয়েছে। নির্দেশনায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় ফোকাল পারসন নিয়োগ, মেডিকেল টিম গঠন, পর্যাপ্ত ওষুধ, ওআরএস, স্যালাইন ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট মজুত রাখাসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদফতর জানিয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে আগামী কয়েক দিন দেশের অধিকাংশ এলাকায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে। আজ রংপুর, ময়মনসিংহ, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য তিন জেলায় নতুন করে ভয়াবহ পাহাড়ধসের আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক দিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া এবং প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























