পর্যায়ক্রমে বদলাবে পোশাক, লোগো ও যানবাহন
বিলুপ্ত র্যাব, এসআরবির যাত্রা শুরু
দীর্ঘ সাড়ে ২২ বছরের পথচলার অবসান ঘটিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হলো র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। এর জায়গায় বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে যাত্রা শুরু করেছে নতুন বিশেষায়িত ইউনিট স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)।
র্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি গঠনের জন্য জাতীয় সংসদে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছিলো ১০ সেপ্টেম্বর। পরে ১৬ সেপ্টেম্বর সরকার আইনটির গেজেট প্রকাশ করে। গেজেট প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই র্যাব বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় এবং নতুন আইনি কাঠামোর অধীনে এসআরবির কার্যক্রম শুরু হয়।
এসআরবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন বাহিনীর কার্যক্রম শুরু হলেও একদিনে সবকিছু পরিবর্তন করা হচ্ছে না। পর্যায়ক্রমে বাহিনীর পোশাক, লোগো, সদস্যদের ব্যাচ, যানবাহনের রং এবং অন্যান্য দৃশ্যমান পরিচয় পরিবর্তন করা হবে। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে মাঠপর্যায়ে র্যাবের বিদ্যমান অবকাঠামো, সরঞ্জাম ও যানবাহনের ব্যবহার অব্যাহত থাকতে পারে।
এক আইনে র্যাবের অবসান, অন্য আইনে নতুন ইউনিট
র্যাবকে আইনি কাঠামো দেয়া হয়েছিলো তৎকালীন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নস অর্ডিন্যান্সে সংশোধনী এনে। নতুন আইন কার্যকর হওয়ার মাধ্যমে সে কাঠামো থেকে র্যাব-সংক্রান্ত বিধান সরিয়ে দেয়া হয়েছে এবং পৃথক আইনের মাধ্যমে এসআরবি গঠন করা হয়েছে।
১০ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। বিলটি উত্থাপনের পর সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছিলো। কমিটি যাচাই-বাছাই শেষে সংশোধিত আকারে বিলটি সংসদে উপস্থাপনের সুপারিশ করে।
আইনটির মূল উদ্দেশ্য হিসেবে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংঘবদ্ধ ও গুরুতর অপরাধ দমন এবং আরও আধুনিক, পেশাদার, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বিশেষায়িত ইউনিট গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।
র্যাবের জনবল-সম্পদ যাবে এসআরবিতে
নতুন আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো র্যাবের বিদ্যমান জনবল ও সম্পদের বড় অংশ নতুন ইউনিটের কাছে হস্তান্তর।
আইন অনুযায়ী র্যাবের সংশ্লিষ্ট জনবল, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুযোগ-সুবিধা, তহবিল, নগদ অর্থ, ব্যাংক হিসাব, দায়-দেনা, চুক্তি, স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাবের বই, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও অন্যান্য দলিল এসআরবির কাছে হস্তান্তরের বিধান রাখা হয়েছে।
এ কারণে আইনগতভাবে র্যাবের বিলুপ্তি হলেও নতুন বাহিনী গঠনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান জনবল ও অবকাঠামোর বড় অংশই ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ নিয়ে সংসদে বিরোধী সদস্যদের আপত্তিও ছিলো। তাদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, র্যাবের জনবল, সম্পদ ও কাঠামোর বড় অংশ নতুন ইউনিটে স্থানান্তর করা হলে নাম পরিবর্তনের বাইরে বাস্তবে কতটা পরিবর্তন আসবে। অন্যদিকে সরকার বলেছে, নতুন আইন ও কাঠামোর মাধ্যমে একটি নতুন, পেশাদার এবং অধিক জবাবদিহিমূলক বিশেষায়িত ইউনিট গড়ে তোলা হচ্ছে।
পুলিশের অধীনে থাকবে এসআরবি
নতুন আইনে এসআরবিকে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে রাখা হয়েছে। সরকারের প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পদায়ন বা প্রেষণে এসআরবিতে নিয়োগ দেয়া যেতে পারে।
ইউনিটটির প্রধান হিসেবে পুলিশে কর্মরত অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেয়ার বিধান রয়েছে। সদস্যদের পদবিন্যাস, নিয়োগের পদ্ধতি এবং চাকরির শর্তাবলি পরবর্তী বিধির মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে।
আইনে এসআরবির জন্য পৃথক পতাকা, প্রতীক ও পোশাকের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। এসব আনুষ্ঠানিক পরিচয় চূড়ান্ত ও বাস্তবায়নে কিছুটা সময় লাগবে। এ কারণে নাম পরিবর্তন কার্যকর হওয়ার পরও মাঠপর্যায়ে পুরোনো র্যাবের সরঞ্জাম বা যানবাহন কিছু সময় দেখা যেতে পারে।
কী কী দায়িত্ব পালন করবে এসআরবি?
নতুন বাহিনীকে মূলত গুরুতর ও সংঘবদ্ধ অপরাধ মোকাবিলার জন্য বিশেষায়িত করা হয়েছে।
আইনে এসআরবির দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে—
- জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা;
- সন্ত্রাসবাদ ও সংঘবদ্ধ অপরাধ দমন;
- গুরুতর অপরাধ মোকাবিলা;
- অবৈধ অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার;
- মাদকবিরোধী অভিযান;
- সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা;
- গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে কার্যক্রম;
- নারী ও শিশু নির্যাতন মোকাবিলা;
- ধর্ষণ, মানবপাচার ও অপহরণের মতো গুরুতর অপরাধ দমন;
- আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ;
- অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া।
এ ছাড়া আদালত, সরকার অথবা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে এসআরবি ফৌজদারি অপরাধের তদন্তও করতে পারবে। আইন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আইনের বিধান মেনে তল্লাশি, গ্রেফতার ও আলামত জব্দের ক্ষমতাও থাকবে।
এসআরবির সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তারা নির্ধারিত ক্ষেত্রে তদন্তকারী কর্মকর্তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন।
অভিযোগ তদন্তে থাকবে আলাদা ব্যবস্থা
নতুন আইনে এসআরবির সদস্যদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
নাগরিকদের অভিযোগের পাশাপাশি বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একাধিক সদস্যের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের বিধান রয়েছে। কমিটি অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান করতে পারবে এবং প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করতে পারবে।
সদস্যদের পদোন্নতি, পদায়ন, বিভাগীয় শাস্তি, হয়রানি কিংবা অন্যায্য আচরণ নিয়ে অভিযোগও এ ব্যবস্থার আওতায় আসবে।
শাস্তির বিধানও থাকছে
শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ প্রমাণিত হলে এসআরবির সদস্যদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি এবং পদোন্নতি স্থগিতের মতো ব্যবস্থা।
বিভাগীয় আদেশের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট সদস্যের আপিলের সুযোগও রাখা হয়েছে। আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আপিল করা যাবে।
এ ছাড়া র্যাবের সময় শুরু হওয়া বিভাগীয় ব্যবস্থা ও চলমান আদালত-সংক্রান্ত কার্যক্রমও আইনটির মাধ্যমে বাতিল হয়ে যাচ্ছে না। সরকারি গেজেটে বলা হয়েছে, আগে শুরু হওয়া বিভাগীয় ও বিচারিক কার্যক্রমের বৈধতা বহাল থাকবে।
দেড় যুগের বেশি র্যাব, এখন নতুন পরিচয়ে বিশেষায়িত ইউনিট
২০০৪ সালে গঠনের পর র্যাব দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থায় একটি বিশেষায়িত বাহিনী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সন্ত্রাসবাদ, মাদক, অস্ত্র, সংঘবদ্ধ অপরাধসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুতর অপরাধ দমনে বাহিনীটির অভিযান আলোচিত হয়েছে।
একই সঙ্গে র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও গুমের অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে দেশ-বিদেশে আলোচিত হয়েছে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বাহিনীটির কাঠামো, ক্ষমতা ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।
এখন র্যাবের সে অধ্যায় শেষ করে এসআরবির যাত্রা শুরু হলো। তবে নতুন বাহিনীর কার্যক্রম কতটা আলাদা হবে, জবাবদিহির নতুন কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং পুরোনো জনবল ও সম্পদ কীভাবে নতুন ব্যবস্থায় পরিচালিত হবে—এসব বিষয়ই এখন সামনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
নতুন নামের পাশাপাশি নতুন কাঠামো, নতুন জবাবদিহি ও নতুন কর্মপদ্ধতি কতটা বাস্তবে কার্যকর হয়, সেটিই হবে এসআরবির সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সবার দেশ/এমকেজে




























