দিল্লিতে শি জিনপিংয়ের অসুস্থতার দাবি ঘিরে রহস্য
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন—সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া এমন দাবিকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দাবি করা হচ্ছে, ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেয়ার সময় শি জ্ঞান হারান এবং পরে গুরুতর স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। এরপর জরুরি চিকিৎসার জন্য তাকে বিশেষ বিমানে করে বেইজিংয়ে ফিরিয়ে নেয়া হয় বলেও দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চীন বা ভারত—কোনও দেশের সরকারই শি জিনপিং জ্ঞান হারিয়েছেন, স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন, অস্ত্রোপচার হয়েছে কিংবা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন—এমন কোনও তথ্য নিশ্চিত করেনি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডেও জানিয়েছে, দাবিগুলোর সমর্থনে কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যে পোস্ট থেকে গুঞ্জনের শুরু
শির অসুস্থতার দাবি ছড়ান চীনা ভিন্নমতাবলম্বী ও চায়না ডেমোক্রেসি পার্টির চেয়ারম্যান ওয়ানজুন শিয়ে। সোশ্যাল মিডিয়া এক্সে দেয়া কয়েকটি পোস্টে তিনি দাবি করেন, ব্রিকস সম্মেলন চলাকালে শি হঠাৎ জ্ঞান হারান। তার সঙ্গে থাকা চিকিৎসকেরা ঘটনাস্থলেই জরুরি চিকিৎসা দেন।
ওয়ানজুনের দাবি অনুযায়ী, এরপর শিকে বিশেষ বিমানে করে বেইজিংয়ে ফিরিয়ে নেয়া হয়। বিমানটি বেইজিং পৌঁছানোর পর তাকে সামরিক হেলিকপ্টারে করে পিপলস লিবারেশন আর্মির জেনারেল হাসপাতালে—যা ৩০১ হাসপাতাল নামে পরিচিত—নিয়ে যাওয়া হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, সেখানে চিকিৎসকেরা শির ‘গুরুতর ইস্কেমিক স্ট্রোক’ শনাক্ত করেন এবং পরে তার অস্ত্রোপচার করা হয়। এমনকি শিকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে এসব বক্তব্যের কোনোটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তার একটি পোস্টে পরে এক্সের ‘কমিউনিটি নোট’ যুক্ত হয়, যেখানে পোস্টের তথ্য বাস্তব ঘটনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
কেনো ছড়ালো শির অসুস্থতার গুঞ্জন?
গুঞ্জনের পেছনে প্রধানত দুটি বিষয় আলোচনায় এসেছে। প্রথমত, নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনের সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শির একটি সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, সম্মেলন শেষে মোদির দেয়া নৈশভোজে শি চিনপিং উপস্থিত ছিলেন না।
নৈশভোজটি নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ কয়েকজন ব্রিকস নেতা উপস্থিত ছিলেন। শির পরিবর্তে চীনের প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।
শি কেনো নৈশভোজে অংশ নেননি, সে বিষয়ে ভারত বা চীন কোনও আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার স্বাস্থ্য নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়। তবে নৈশভোজে অনুপস্থিত থাকা নিজেই শির অসুস্থতার প্রমাণ নয়।
সরকারি তথ্য কী বলছে?
চীনের সরকারি সূত্রের তথ্য শির অসুস্থতার দাবিকে নিশ্চিত করছে না। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেয়ার পর ১৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় শি চিনপিং বেইজিংয়ে ফিরে যান। তার সফরসঙ্গীদের মধ্যে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক ব্যুরোর স্থায়ী কমিটির সদস্য কাই ছি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইও ছিলেন। তারা একই বিমানে বেইজিং ফেরেন।
চীনের সরকারি বিবরণে আরও বলা হয়েছে, নয়াদিল্লি ত্যাগের সময় ভারতীয় কর্মকর্তারা শিকে বিদায় জানান। সরকারি বিবরণে তার অসুস্থতা, জরুরি চিকিৎসা বা হাসপাতালে নেয়ার কোনও উল্লেখ নেই।
অর্থাৎ, প্রকাশ্য সরকারি রেকর্ডে শির ব্রিকস সফর শেষে স্বাভাবিকভাবে বেইজিং ফেরার তথ্য রয়েছে; তবে তার দেশে ফেরার পরবর্তী স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত কোনও মেডিকেল তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ব্রিকস সম্মেলনে সক্রিয় ছিলেন শি
১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে পৌঁছানোর পর শি চিনপিং ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেন। এটি ছিল সাত বছর পর তার প্রথম ভারত সফর। সম্মেলনের ফাঁকে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করেন।
দুই নেতার আলোচনায় ভারত-চীন সম্পর্ক, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। একই সঙ্গে ব্রিকস সম্মেলনে শি পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের অবসানে সদস্য দেশগুলোকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
শি আরও ঘোষণা করেন, আগামী বছর ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব নেবে চীন এবং ১৯তম ব্রিকস সম্মেলন চীনেই অনুষ্ঠিত হবে।
শির অসুস্থতার দাবির উৎস কে?
ওয়ানজুন শি চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সমালোচক এবং চায়না ডেমোক্রেসি পার্টির সঙ্গে যুক্ত। চীনে এ রাজনৈতিক সংগঠন নিষিদ্ধ। সংগঠনটি বহুদলীয় সাংবিধানিক গণতন্ত্র, সরাসরি নির্বাচন, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের পক্ষে অবস্থান নেয়।
চায়না ডেমোক্রেসি পার্টি ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে চীনা কর্তৃপক্ষ সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করে এবং এর কয়েকজন নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। সংগঠনটির কার্যক্রম পরে মূলত চীনের বাইরে থেকে পরিচালিত হতে থাকে।
ফলে শির স্বাস্থ্য নিয়ে ওয়ানজুন শির বক্তব্যের ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও চীনা সরকারের সঙ্গে তার বিরোধের বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। তবে এর অর্থ এ নয় যে তার প্রতিটি বক্তব্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভুল; বরং বর্তমান দাবিটির ক্ষেত্রে স্বাধীন প্রমাণের অনুপস্থিতিই মূল বিষয়।
তাহলে শি চিনপিংয়ের কী হয়েছে?
এ মুহূর্তে প্রকাশ্য ও যাচাইযোগ্য তথ্য থেকে শি চিনপিং স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন বা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই।
অন্যদিকে, চীনা সরকারও তার স্বাস্থ্যের বিষয়ে বিস্তারিত কোনও মেডিকেল বুলেটিন প্রকাশ করেনি। ফলে শির বর্তমান শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে প্রকাশ্য তথ্য সীমিত।
সব মিলিয়ে, শি চিনপিংয়ের স্ট্রোক ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবরটি এখন পর্যন্ত একটি অযাচাইকৃত দাবি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া পোস্ট, সম্মেলনের নৈশভোজে তার অনুপস্থিতি এবং একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিওকে কেন্দ্র করে যে জল্পনা তৈরি হয়েছে, তা এখনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণে পরিণত হয়নি।
চীনা প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্য নিয়ে ভবিষ্যতে চীনা বা ভারতীয় সরকারি বিবৃতি, হাসপাতাল-সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য অথবা একাধিক স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যমের যাচাই করা প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হতে পারে।
চাইলে এটিকে আমি আরও জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতার উপযোগী ৭০০–৮০০ শব্দের টানটান নিউজ, অথবা অনলাইন নিউজ পোর্টালের SEO-ফ্রেন্ডলি ভার্সন হিসেবেও সাজিয়ে দিতে পারি।
সবার দেশ/এমকেজে




























