দেশ-বিদেশের ব্যাংক হিসাব, বিনিয়োগ ও অর্থপাচারের তথ্য চেয়ে বিএফআইই
আসিফ ও তার স্ত্রীর সম্পদের খোঁজে দুদক
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া এবং তার স্ত্রী আয়েশা আক্তার পান্নার দেশ-বিদেশের সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছে তথ্য চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুদকের উপপরিচালক মো. জাহিদ কালামের সই করা চিঠিতে আসিফ মাহমুদ, তার স্ত্রী এবং তাদের সঙ্গে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানির সম্পদ এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দুদকের এ পদক্ষেপ আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধানেরই অংশ। এর আগে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নিয়োগ ও পদায়নে অনিয়ম এবং বিদেশে অর্থপাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগ অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছে দুদক। এসব অভিযোগ এখনও অনুসন্ধানাধীন; অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনও সিদ্ধান্ত দুদক দেয়নি।
কোন কোন তথ্য চাওয়া হয়েছে
দুদকের চিঠিতে আসিফ মাহমুদ ও তার স্ত্রীর নামে থাকা ব্যাংক ও আর্থিক হিসাবের বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে থাকা হিসাব, লেনদেন, ঋণ, এফডিআর, ডিপিএস, সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য আর্থিক পণ্যের তথ্য রয়েছে।
একই সঙ্গে আসিফ মাহমুদ বা তার স্ত্রী এবং তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির নামে থাকা সম্পদ ও আর্থিক লেনদেনের তথ্যও চাওয়া হয়েছে।
দুদকের নথিতে আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, দেশে কোম্পানি গঠন, বিদেশে নাগরিকত্ব গ্রহণ এবং অর্থপাচারের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পাঁচ দেশে সম্পদের অভিযোগ
চিঠিতে পর্তুগাল, অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে সম্পদ, বিনিয়োগ ও ব্যাংক হিসাব থাকার অভিযোগের বিষয়েও তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এসব দেশে আসিফ মাহমুদ বা তার স্ত্রী কিংবা তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির নামে কোনও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, বিনিয়োগ বা ব্যাংক হিসাব রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট দেশের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে যাচাইয়ের উদ্যোগ নিতে বিএফআইইউকে বলা হয়েছে।
এর আগে ১৩ সেপ্টেম্বর দুদক জানিয়েছিলো, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে বিপুল অর্থপাচারের অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং সেটি আগে থেকে চলমান অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে তদন্ত করা হবে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে অভিযোগের অঙ্ক প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দুদক নিজেই বলেছে, এসব অভিযোগ অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে এবং সত্যতা এখনও প্রমাণিত হয়নি।
নিয়োগ, বদলি ও টেন্ডার নিয়েও অনুসন্ধান
আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে শুধু সম্পদ ও অর্থপাচারের অভিযোগ নয়, সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে অনিয়মের অভিযোগও অনুসন্ধান করছে দুদক।
গত ২ সেপ্টেম্বর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকাকালে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলিতে অনিয়মের অভিযোগে আসিফ মাহমুদসহ চারজনের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। পরদিন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট নথি ও তথ্য চেয়ে চিঠি দেয়া হয়।
এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর তার বিরুদ্ধে আরও কিছু অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্তের কথা জানায় দুদক। এসব অভিযোগের মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ, বিভিন্ন জেলায় ডিসি পদায়ন, বিভিন্ন সিটি করপোরেশনের টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন নেয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আসিফ
দুদকের অনুসন্ধান ও অভিযোগের বিষয়ে আসিফ মাহমুদ অবশ্য তা অস্বীকার করেছেন। তিনি দুদকের কার্যক্রমকে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ ও রাজনৈতিকভাবে হয়রানির অংশ বলে দাবি করেছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগগুলোর কিছু তথ্য বিভ্রান্তিকর এবং তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রচার করা হচ্ছে।
অন্যদিকে দুদক বলেছে, আসিফ মাহমুদকে লক্ষ্য করে বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অনুসন্ধান করা হচ্ছে না। দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো আইন অনুযায়ী যাচাই করা হচ্ছে এবং অনুসন্ধান শেষ হওয়ার আগে কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
এর আগে ব্যাংক হিসাব প্রকাশ করেছিলেন আসিফ
এরই মধ্যে বিএফআইইউ ব্যাংক হিসাবের তথ্য চাওয়ার পর আসিফ মাহমুদ নিজের ও পরিবারের সদস্যদের কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রকাশ করেছিলেন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি নিজের দুটি, বাবার পাঁচটি এবং মা ও স্ত্রীর একটি করে মোট নয়টি ব্যাংক হিসাবের তথ্য প্রকাশ করেন। তার দাবি অনুযায়ী, এসব হিসাবে মোট জমা ছিলো প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ টাকা। তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব ছাড়ার সময়ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে নিজের আয় ও সম্পদের বিবরণী জমা দিয়েছিলেন।
তবে দুদকের বর্তমান অনুসন্ধান শুধু ব্যাংক হিসাবে থাকা অর্থের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দেশ-বিদেশের সম্পদ, বিনিয়োগ, কোম্পানি, আর্থিক লেনদেন এবং সম্ভাব্য অর্থপাচারের অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় রাখা হয়েছে।
অনুসন্ধানের ফলের অপেক্ষা
দুদকের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আসিফ মাহমুদ বা তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন বা অর্থপাচারের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমন কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। বিএফআইইউসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার পর অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে।
ফলে বর্তমানে আসিফ মাহমুদ ও তার স্ত্রীর সম্পদ নিয়ে যে বিষয়টি সামনে এসেছে, তা দুদকের অনুসন্ধান ও তথ্য যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। দেশ-বিদেশের আর্থিক তথ্য হাতে পাওয়ার পরই অভিযোগগুলোর বাস্তব ভিত্তি সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
সবার দেশ/এমকেজে




























