বিচারপতি আসাদুজ্জামান নেতৃত্বাধীন কমিশন গঠন
আজ থেকে নতুন পথচলা দুদকের
দীর্ঘ পাঁচ মাসেরও বেশি সময় শূন্য থাকার পর আজ বুধবার (১৯ আগষ্ট) থেকে নতুন কমিশনের নেতৃত্বে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের নতুন কমিশন গতকাল মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগদান করেছে। আজ সকাল থেকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে বসবেন তারা।
নতুন কমিশনের অপর দুই সদস্য হলেন অবসরপ্রাপ্ত সচিব ড. জাহাঙ্গীর আলম খান এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর কমিশনার ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। দুদক সচিব সাইদুর রহমান খান জানিয়েছেন, বুধবার তিন কমিশনারই সংস্থার কার্যালয়ে গিয়ে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে। সোমবার গেজেটের মাধ্যমে নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর ২টার দিকে তারা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে যোগদান করেন। বুধবার থেকে দুদক কার্যালয়ে এসে দায়িত্ব পালন শুরু করবেন তারা।
নতুন কমিশনের দায়িত্ব গ্রহণকে দুদকের ‘নতুন যাত্রা’ হিসেবে দেখছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা। দুদক সচিব বলেন, বুধবার সকালে নতুন কমিশন কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবে। দেশের মানুষ দুদকের কাছে যে প্রত্যাশা করেন, নতুন কমিশন তা পূরণে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
বিচারপতির নেতৃত্বে নতুন কমিশন
গত ১৭ আগস্ট সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানকে দুদকের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেয়া হয়। রাষ্ট্রপতির পক্ষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব নাসিমুল গনি এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেন। একই প্রজ্ঞাপনে ড. জাহাঙ্গীর আলম খান ও ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়াকে কমিশনার নিয়োগ দেয়া হয়।
নতুন চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আপিল বিভাগ থেকে অবসর নেন। দীর্ঘ বিচারিক জীবনে তিনি হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।
১৯৫৯ সালের ১ মার্চ নওগাঁর সাপাহার উপজেলার খঞ্জনপুর তালকুড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা ছিলেন অ্যাডভোকেট এম. এ. সামাদ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলএম সম্পন্ন করে ১৯৮৩ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জেলা আদালতের আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৮৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট বিভাগের আইনজীবী হন। ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন।
২০০৩ সালের ২৭ আগস্ট হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত বিচারক হিসেবে নিয়োগ পান এ কে এম আসাদুজ্জামান। ২০০৫ সালের একই দিনে হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হন। প্রায় দুই দশক হাইকোর্ট বিভাগে দায়িত্ব পালনের পর ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ তাকে আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
আলোচিত কয়েকটি মামলার বিচারক
হাইকোর্টে দায়িত্ব পালনের সময় বিচারপতি আসাদুজ্জামান বেশ কিছু আলোচিত মামলায় রায় ও আদেশ দিয়েছেন। ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই তার নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার একটি মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি জামিন মঞ্জুর করেন।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ওই মামলায় খালেদা জিয়ার জামিনের মেয়াদও বৃদ্ধি করেন তিনি। ২০১৮ সালের ৩০ জুলাই তার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ একটি মানহানি মামলায় ‘আমার দেশ’ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে জামিন দেন।
এ ছাড়া ২০১৯ সালের ২০ জুন টাঙ্গাইল-৩ আসনের তৎকালীন আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য আমানুর রহমান রানার জামিন মঞ্জুর করেন তিনি। ২০২০ সালের ১৪ অক্টোবর সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আসিফ ইমতিয়াজ খান জিসাদের রহস্যজনক মৃত্যুর মামলায় অভিযুক্ত আসামিদের জামিন আবেদন নাকচ করেন তার নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ।
দুই কমিশনারের পরিচয়
নতুন কমিশনের কমিশনার (অনুসন্ধান) হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ড. সাজ্জাদ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর কমিশনার। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
অন্যদিকে কমিশনার (তদন্ত) ড. জাহাঙ্গীর আলম খান একজন অবসরপ্রাপ্ত সচিব। তিনি ১৯৮৫ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।
পাঁচ মাসের বেশি সময় কমিশন ছিলো শূন্য
গত ৩ মার্চ ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন দুদক কমিশনের চেয়ারম্যানসহ তিন কমিশনার পদত্যাগ করেন। এরপর থেকেই কমিশন কার্যত শূন্য ছিলো। পাঁচ মাসেরও বেশি সময় পর নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার নিয়োগ দেয়া হলো।
নতুন কমিশন গঠনের আগে আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হককে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হয়। সার্চ কমিটি দুদকের শূন্য তিন পদের বিপরীতে ছয়জনের নাম সুপারিশ করে। সেখান থেকেই তিনজনকে চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
দুই দশক পর বিচার বিভাগের নেতৃত্ব
২০০৪ সালে আইন করে ‘দুর্নীতি দমন ব্যুরো’কে বিলুপ্ত করে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন’ প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠার ২২ বছর পর এবার আবারও একজন বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাকে কমিশনের চেয়ারম্যান করা হলো।
দুদকের প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। তবে তার নেতৃত্বাধীন কমিশন শুরু থেকেই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখে পড়ে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। পরবর্তী সময়ে দুদকের চেয়ারম্যান পদটি মূলত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের দখলে চলে যায়।
নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামানের নিয়োগের মধ্য দিয়ে সে ধারায় বড় পরিবর্তন এসেছে। বিচার বিভাগের একজন সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তার নেতৃত্বে নতুন কমিশন দুর্নীতি দমন কার্যক্রমে কতটা গতি ও স্বাধীনতা আনতে পারে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে।
সবার দেশ/কেএম




























