বিদায় জানালো জাতি
পরমাণু বিজ্ঞানী শমশের আলী আর নেই
বাংলাদেশের প্রখ্যাত পরমাণু বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ এবং উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক এম শমশের আলী আর নেই। শনিবার রাত ২টার দিকে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি… রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৮৪ বছর।
উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রোববার বাদ জোহর ধানমন্ডি ৭ নম্বরের বায়তুল আমান মসজিদে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। মরহুমের সম্মানে ও শোক পালনে বিশ্ববিদ্যালয়ে একদিনের ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
বিজ্ঞান ও শিক্ষায় অসামান্য অবদান
অধ্যাপক শমশের আলী ছিলেন বাংলাদেশের পরমাণু বিজ্ঞানের অন্যতম পথিকৃৎ। ১৯৬১ সালে পাকিস্তান আণবিক শক্তি কমিশনে যোগদানের মাধ্যমে তিনি গবেষণার যাত্রা শুরু করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য ১৯৬০-এর দশকে যুক্তরাজ্যে যান এবং ১৯৬৫ সালে ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থিওরেটিক্যাল নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। একই বছরে দেশে ফিরে ঢাকার আণবিক শক্তি কেন্দ্রে সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার হিসেবে যোগ দেন।
১৯৮২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে যোগদানের পর তার গবেষণা, শিক্ষণ ও একাডেমিক কর্মকাণ্ড দেশীয় বিজ্ঞান চর্চায় নতুন মাত্রা এনে দেয়। ১৯৯২ সালে তিনি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং শিক্ষার প্রসারে বড় ভূমিকা রাখেন।
নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
অধ্যাপক শমশের আলী ২০০২ সালে সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্বও পালন করেন। ২০০৪ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমির সভাপতি ছিলেন। পাশাপাশি তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির আজীবন সদস্য এবং আমেরিকান ফিজিক্যাল সোসাইটির সদস্য ছিলেন।
লেখনীতে বিজ্ঞান ও ধর্মের সমন্বয়
শমশের আলী শুধু একজন বিজ্ঞানীই নন, তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান লেখক। তার লেখনীতে বিজ্ঞানের পাশাপাশি ধর্ম ও প্রযুক্তির মিলন ঘটে। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘পবিত্র কোরআনে বৈজ্ঞানিক ইঙ্গিত’, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে মুসলিম অবদান’ এবং ‘আলাদিনস রিয়েল ল্যাম্প: সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’। এসব বই গবেষক, শিক্ষার্থী এবং সাধারণ পাঠকের মধ্যে সমাদৃত।
জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি বিজ্ঞানচর্চা
১৯৪০ সালের ৯ নভেম্বর কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় জন্ম নেয়া শমশের আলী যশোর জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং রাজশাহী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ১৯৫৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে অনার্স ও ১৯৬০ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন।
শিক্ষাজীবনের শুরু থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বিজ্ঞানচর্চা, গবেষণা এবং শিক্ষা বিস্তারে তার অবদান বাংলাদেশকে সমৃদ্ধ করেছে।
জাতির শোক ও শ্রদ্ধাঞ্জলি
তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ হারালো একজন নিবেদিত প্রাণ বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও চিন্তাবিদকে। সহকর্মী, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং সাধারণ মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় গভীর শোক ও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। বিজ্ঞান অঙ্গন তার অবদানকে যুগ যুগ ধরে স্মরণ করবে।
রোববার জানাজা শেষে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। বিদায় পরমাণু বিজ্ঞানী শমশের আলী—বাংলাদেশের বিজ্ঞান ইতিহাসে আপনার নাম অম্লান থাকবে।
সবার দেশ/কেএম




























