পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে মুক্ত হচ্ছেন নিষিদ্ধ আ.লীগ নেতারা!
চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যা ও সহিংসতাসহ বিভিন্ন মামলায় গ্রেফতার হওয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ জঙ্গি আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী জামিনে মুক্ত হয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সময়ে ৬৪টি মামলায় গ্রেফতার হওয়া ১ হাজার ৪৫৫ জনের মধ্যে সোমবার পর্যন্ত ১ হাজার ১০০ জন জামিনে কারামুক্ত হয়েছেন।
তবে কারামুক্তির এ প্রক্রিয়াকে ঘিরে উঠেছে নানা অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের একাংশের দাবি, কারা কর্তৃপক্ষ ও থানা-পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করেই কিছু আসামি দ্রুত মুক্তি পাচ্ছেন। যদিও পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলছে, আদালতের নির্দেশ এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পরই আসামিদের মুক্তি দেয়া হয়।
জামিনে মুক্ত হওয়া অনেক নেতাকর্মী প্রকাশ্যে এলাকায় না থাকলেও তাদের একটি অংশ গোপনে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
৬৪ মামলায় গ্রেফতার ১,৪৫৫
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) জনসংযোগ শাখার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগরের ১৬টি থানার মধ্যে ৮টি থানায় জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ৬৪টি মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ১৪টি। সবচেয়ে বেশি ১৮টি মামলা হয়েছে কোতোয়ালি থানায়।
এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি রয়েছেন ৩ হাজার ১৪৭ জন। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ৫ হাজার ৯১১ জনকে। সোমবার পর্যন্ত এসব মামলায় মোট ১ হাজার ৪৫৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১০০ জন ইতোমধ্যে জামিনে মুক্ত হয়েছেন।
এ পর্যন্ত ছয়টি মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে কোতোয়ালি থানার একটি, সদরঘাট থানার দুটি, চান্দগাঁও থানার একটি হত্যা মামলা এবং খুলশী থানার দুটি মামলা রয়েছে। এছাড়া ঘটনার সত্যতা না পাওয়ায় খুলশী থানার একটি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা।
তদন্তাধীন মামলায় ‘গ্রেফতার বাণিজ্যের’ অভিযোগ
বাকি ৫৭টি মামলা এখনও তদন্তাধীন রয়েছে। এসব মামলায় আসামি অন্তর্ভুক্ত করা, নাম বাদ দেয়া এবং গ্রেফতারকে কেন্দ্র করে অনিয়ম ও ‘গ্রেফতার বাণিজ্যের’ অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীদের অনেকে।
তাদের দাবি, এজাহারভুক্ত কিছু আসামি পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ ও প্রভাব খাটিয়ে এলাকায় ঘোরাফেরা করছেন। অন্যদিকে, নতুন মামলায় নিরীহ ব্যক্তিদেরও জড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্তের কথা বলা হয়েছে।
জামিনে মুক্ত হয়েছেন যারা
জামিনে মুক্ত হওয়া নেতাকর্মীদের মধ্যে রয়েছেন বায়েজিদ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল নবী লেদু ওরফে লেদু হাজী, অর্থ সম্পাদক রফিক উদ্দিন কালু, চকবাজার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনসারুল হক এবং সাংগঠনিক সম্পাদক কায়সার হামিদ।
এ ছাড়া বাকলিয়া থানা আওয়ামী লীগের সদস্য মোহাম্মদ আফসার, ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর শফিকুল ইসলাম, ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহেদুল আজম শাকিল, আওয়ামী লীগ নেতা আবু সায়েদ মিন্টু, কাপাসগোলা ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী সেলিমসহ আরও অনেকে রয়েছেন।
জামিন পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ ও ছাত্রলীগেরও একাধিক নেতা রয়েছেন।
গোপনে চলছে সাংগঠনিক তৎপরতা?
আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা দাবি করেছেন, গ্রেফতার ও মামলার কারণে প্রকাশ্যে সক্রিয় না থাকলেও তারা গোপনে দলীয় যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা শফিকুল ইসলাম বলেন, তার বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নয়টি মামলা হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, কয়েকটি মামলায় বাদীপক্ষের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করেছেন।
সম্প্রতি এক আওয়ামী লীগ নেতার কারামুক্তির বিষয়ে মধ্যস্থতার অভিযোগ ওঠা যুব মহিলা লীগ নেত্রী সোনিয়া আজাদও দাবি করেন, তার স্বামীর বিষয়টি তিনি নিজেই ‘হ্যান্ডল’ করেছেন এবং এ ধরনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে তার ধারণা রয়েছে।
যা বলছে পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষ
সিএমপির সহকারী পুলিশ কমিশনার (জনসংযোগ) আমিনুর রশিদ বলেন, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী গ্রেফতার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। একইভাবে আদালতের নির্দেশে কেউ জামিন পেলে কারামুক্ত হচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, জামিনে মুক্ত হওয়া আসামিদের মধ্যে যাদের বিরুদ্ধে আইনগতভাবে নজরদারির প্রয়োজন রয়েছে, সংশ্লিষ্ট থানা-পুলিশ তাদের পর্যবেক্ষণে রেখেছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার সৈয়দ শাহ্ শরীফ বলেন, কোনো আসামির জামিননামা কারাগারে পৌঁছালে নিয়ম অনুযায়ী সিটিএসবি ও ডিএসবিকে জানানো হয়। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অন্য কোনও মামলা বা গ্রেফতারি পরোয়ানা থাকলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়। অন্যথায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ক্লিয়ারেন্সের পর তাকে মুক্তি দেয়া হয়।
তার দাবি, আদালতের জামিন আদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কারা কর্তৃপক্ষের নিজস্ব কোনও সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ নেই।
প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে
চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া মামলাগুলোতে বিপুলসংখ্যক গ্রেফতার এবং তাদের বড় অংশের জামিনে মুক্তি নিয়ে এখন নানা প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে যেমন পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে কারামুক্তি ও মামলার আসামিদের এলাকায় ঘোরাফেরার অভিযোগ রয়েছে, অন্যদিকে পুলিশ ও কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, পুরো প্রক্রিয়াই আদালতের নির্দেশ ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে।
তাই অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে প্রয়োজন স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত। একই সঙ্গে মামলায় প্রকৃত অপরাধীরা যাতে আইনের আওতায় আসে এবং কোনও নিরীহ ব্যক্তি যাতে হয়রানির শিকার না হন—সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
সবার দেশ/কেএম




























