ওমান যাওয়ার আগমুহূর্তে ঘটেছিলো ভয়াবহ দুর্ঘটনা
ট্রেনের নিচে পড়ে বেঁচে যাওয়া বাবা-ছেলের পরিচয় মিলেছে
ভৈরব রেলওয়ে স্টেশন-এ চলন্ত ট্রেনের নিচে পড়ে গিয়েও অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে যাওয়া বাবা-ছেলের পরিচয় মিলেছে। বুধবার (২৯ এপ্রিল) রাতে জানা যায়, এক বছর বয়সী শিশুটির নাম সৌরভ এবং তার বাবা জহিরুল ইসলাম সোহান (৩২)। শিশুটির মায়ের নাম সুমাইয়া আক্তার।
তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদি উপজেলার লোহাজুড়ি ইউনিয়নের চরকাউনিয়া বাজার এলাকায়। জহিরুল দীর্ঘ ১০ বছর ধরে ওমানে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ভোরেই তার আবার ওমান ফিরে যাওয়ার কথা ছিলো।
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঢাকায় যাওয়ার পথেই ঘটে যায় শ্বাসরুদ্ধকর এ দুর্ঘটনা।
পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার দুপুরে স্ত্রী ও এক বছরের সন্তানকে নিয়ে ভৈরব থেকে তিতাস কমিউটার ট্রেনে করে ঢাকায় যাচ্ছিলেন জহিরুল। ট্রেনে ওঠার কিছুক্ষণ পর তার মনে পড়ে যায়, বিদেশযাত্রার জন্য প্রয়োজনীয় পাসপোর্ট তিনি ভুলে বাড়িতে রেখে এসেছেন।
এ কথা মনে হতেই দ্রুত ট্রেন থেকে নামার চেষ্টা করেন তারা। কিন্তু ঠিক সে মুহূর্তে ট্রেনটি স্টেশন ছেড়ে চলতে শুরু করে।
প্রথমে নামতে গিয়ে ট্রেনের হাতল ধরতে চেষ্টা করেন স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। কিন্তু হাত ফসকে তিনি প্ল্যাটফর্মে পড়ে যান। এ সময় তাদের শিশু সন্তান সৌরভ ফাঁক গলে ট্রেনের নিচে পড়ে যায়।
ছেলেকে ট্রেনের নিচে পড়ে যেতে দেখে কোনও কিছু না ভেবেই ঝাঁপ দেন বাবা জহিরুল ইসলাম সোহান। তিনি দ্রুত ছেলেকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে রেললাইনের পাশে শরীর চেপে শুয়ে পড়েন। আর তাদের ওপর দিয়েই চলতে থাকে ট্রেনের একের পর এক বগি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আটটি বগি পার হওয়ার পরও বাবা-ছেলে অলৌকিকভাবে জীবিত অবস্থায় বেরিয়ে আসেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সবাই তখন হতবাক হয়ে যান।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও তিতাস কাউন্টারের কর্মী ফালু মিয়া বলেন, ট্রেন ছাড়ার পর দেখি কেউ একজন নিচে পড়ে গেছে। দৌড়ে গিয়ে দেখি, এক ব্যক্তি তার সন্তানকে জড়িয়ে ট্রেনের নিচে পড়ে আছেন। তার স্ত্রীও ট্রেনের নিচে চলে যেতে চাইছিলেন, তখন আমরা তাকে ধরে রাখি। এমন ঘটনা জীবনে দেখিনি। আল্লাহর রহমতেই তারা বেঁচে গেছেন।
স্টেশনের দোকানি সোহেল মিয়া বলেন, ঘটনাটি দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। মনে হয়েছে— রাখে আল্লাহ মারে কে। এমন দৃশ্য কখনও ভুলতে পারবো না।
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জহিরুল ইসলাম সোহান। তিনি বলেন, এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিলো, আমি আর আমার ছেলে হয়তো বাঁচবো না। ট্রেনের বগিগুলো একটার পর একটা মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছিলো। ভাবতেই পারিনি আবার পৃথিবীর আলো দেখতে পারবো। সারারাত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করেছি।
তিনি জানান, দুই বছর আগে দেশে এসে বিয়ে করেন। গত বছর তাদের ছেলে সৌরভের জন্ম হয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতে দেশে ফেরেন তিনি। চার মাস পরিবারের সঙ্গে কাটিয়ে আবার ওমান ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। সে কারণেই স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় যাচ্ছিলেন।
বাংলাদেশ রেলওয়ে-এর ভৈরব স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো. ইউসুফ বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ট্রেন ছাড়ার সময় ওই দম্পতি সন্তানসহ নামার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলেন, যাত্রীদের সচেতনতার অভাব রয়েছে। তবে বাবা-ছেলে বেঁচে যাওয়ায় আমরা সবাই স্বস্তি পেয়েছি।
এদিকে বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশ-এর ভৈরব রেলওয়ে থানার এসআই আফজাল হোসেন যাত্রীদের চলন্ত ট্রেনে ওঠানামা না করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ট্রেনে যাতায়াতের সময় সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। একই দিনে আরেকটি দুর্ঘটনায় কালিকাপ্রসাদ এলাকায় ট্রেনের ধাক্কায় শাহীন মিয়া নামে এক যুবক মারা গেছেন। তাই যাত্রীদের সচেতন করতে স্টেশনে পুলিশি টহল বাড়ানো হয়েছে।
সবার দেশ/কেএম




























