২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন রেমিট্যান্স— ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির হাতছানি!
বাংলাদেশ আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে একটি মৌলিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে—আমরা কি আমাদের বিপুল যুবসমাজকে কেবল কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকা একটি জনগোষ্ঠী হিসেবে দেখবো, নাকি পরিকল্পিত বিনিয়োগের মাধ্যমে তাদের জাতীয় সম্পদে রূপান্তর করবো?
দক্ষতা উন্নয়ন, দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থান, রেমিট্যান্স, বিদেশফেরত কর্মীদের পুনঃসংযুক্তি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) উন্নয়ন এবং সার্কুলার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট—এ বিষয়গুলো আলাদা আলাদা নয়। এগুলো একে অন্যের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। ২০২৬ থেকে ২০৩০—এ পাঁচ বছর বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সময়কাল নয়; এটি একটি নির্ধারক পর্ব।
জনসংখ্যা সমস্যা নয়, সমস্যা পরিকল্পনার:
বাংলাদেশের যুব জনসংখ্যা প্রায় ছয় কোটির কাছাকাছি। বহু বছর ধরে এ সংখ্যাকে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে সে ডিভিডেন্ড পুরোপুরি কাজে লাগেনি। কারণ, জনসংখ্যা নিজে কখনও সম্পদ হয় না—পরিকল্পনা ছাড়া জনসংখ্যা বরং অর্থনীতির ওপর চাপ হয়ে দাঁড়ায়। আজকের বাস্তবতা হলো, একদিকে শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে দেশীয় শিল্প, সেবা খাত ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির তীব্র ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। এ বৈপরীত্যই নির্দেশ করে যে সমস্যার মূল জনসংখ্যায় নয়, বরং দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে কাঠামোগত সংযোগহীনতায়।
শিক্ষা বনাম দক্ষতা— কাঠামোগত ফাঁক:
গত দুই দশকে বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তার হয়েছে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, শিক্ষার্থীর সংখ্যাও বেড়েছে। কিন্তু এ শিক্ষা প্রধানত ডিগ্রি-কেন্দ্রিক, কর্মসংস্থান-কেন্দ্রিক নয়। ফলে তরুণরা সনদ নিয়ে বের হলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত হয় না।
বিশ্ব শ্রমবাজারে বর্তমানে যে দক্ষতার চাহিদা সবচেয়ে বেশি, তা হলো কেয়ারগিভার ও এজড কেয়ার কর্মী, নির্মাণ ও অবকাঠামো দক্ষতা, ইলেকট্রিক্যাল ও ওয়েল্ডিং ট্রেড, ম্যানুফ্যাকচারিং ও ফ্যাক্টরি টেকনিশিয়ান, হসপিটালিটি ও সার্ভিস সেক্টর এবং ডিজিটাল ও রিমোট সার্ভিস। এ খাতগুলোর জন্য প্রয়োজন কাজ–ভিত্তিক দক্ষতা, যা আমাদের মূলধারার শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্তভাবে দিতে পারছে না।
দেশে–বিদেশে ১ কোটি কর্মসংস্থান— সংখ্যার আড়ালে সিস্টেম:
২০২৬–২০৩০ সময়কালে দেশে ও বিদেশে মিলিয়ে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান—শুনতে উচ্চাভিলাষী মনে হলেও খাতভিত্তিক ও সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা থাকলে এটি অসম্ভব নয়।
বিদেশে কর্মসংস্থান মানে কেবল মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক কম দক্ষ শ্রম রফতানি নয়। জাপান ও ইউরোপে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর জন্য কেয়ার ও টেকনিক্যাল স্কিল, পূর্ব এশিয়ায় ম্যানুফ্যাকচারিং দক্ষতা, মধ্যপ্রাচ্যে নির্মাণ ও সার্ভিস খাত এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে রিমোট কাজ—এ সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের বাস্তব সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে এসএমই, কৃষিভিত্তিক ভ্যালু চেইন, লজিস্টিকস ও সার্ভিস ইকোনমিতে কর্মসংস্থানের বিশাল সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন ডিমান্ড–লেড স্কিলিং—অর্থাৎ আগে চাহিদা নির্ধারণ, পরে প্রশিক্ষণ।
কর্মক্ষেত্রভিত্তিক ডিমান্ড ম্যাপিং ও এম্বাসির ভূমিকা
দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো—চাহিদা নির্ধারণ ছাড়াই প্রশিক্ষণ দেয়া। এ জায়গায় জরুরি হলো কর্মক্ষেত্রভিত্তিক ও দেশভিত্তিক ডিমান্ড ম্যাপিং। বাংলাদেশের বিদেশি মিশন ও এম্বাসিগুলোকে কেবল কনস্যুলার সেবায় সীমাবদ্ধ না রেখে লেবার মার্কেট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট হিসেবে গড়ে তোলা প্রয়োজন। তারা স্থানীয় নিয়োগকর্তা, চেম্বার অব কমার্স ও ট্রেড সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করে বৈধ কর্মসংস্থানের পাইপলাইন তৈরি করতে পারে। এতে দালালনির্ভরতা কমবে এবং বৈদেশিক কর্মসংস্থান আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ হবে।
এনএসডিএ শক্তিশালীকরণ ও প্রাইভেট স্কিল ডেভেলপমেন্ট বোর্ড:
দক্ষতা উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হলো জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ)। কিন্তু বর্তমান কাঠামোতে এনএসডিএ–র সক্ষমতা, জনবল ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতা সীমিত। এনএসডিএ–কে শক্তিশালী করে তার অধীনে কিছু প্রাইভেট স্কিল ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠন করা যেতে পারে, যার মূল দায়িত্ব হবে বেসরকারি ও ক্ষুদ্র প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটগুলোর মান নিয়ন্ত্রণ। বাংলাদেশে হাজার হাজার ছোট প্রশিক্ষণ কেন্দ্র রয়েছে, যেগুলোর অনেকগুলোর মান অসম এবং নিয়ন্ত্রণহীন। এ বোর্ডের মাধ্যমে কারিকুলাম স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন, প্রশিক্ষকের যোগ্যতা যাচাই, আউটকাম–বেইসড অ্যাক্রেডিটেশন এবং নিয়মিত মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে দক্ষতা উন্নয়নের গুণগত মান ও স্কেল—দুটোই রক্ষা করা সম্ভব হবে।
Train the Trainers— স্কেলিংয়ের পূর্বশর্ত:
এক কোটি মানুষকে দক্ষ করে তোলার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রশিক্ষকের ঘাটতি। এ জায়গায় Train the Trainers (ToT) প্রোগ্রাম অপরিহার্য। বিদেশফেরত দক্ষ কর্মী, অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান ও শিল্প–সংযুক্ত পেশাজীবীদের প্রশিক্ষক হিসেবে গড়ে তুললে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষতা দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হবে। এটি দীর্ঘমেয়াদে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ স্কিল ইকোসিস্টেম তৈরি করবে।
দেশভিত্তিক ভাষা শিক্ষা— আয়ের মাল্টিপ্লায়ার:
ভাষা দক্ষতা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে আয়ের সবচেয়ে বড় গুণক। জাপান, কোরিয়া, জার্মানি বা আরব দেশ—প্রতিটি দেশের জন্য আলাদা ভাষা ও কর্মসংস্কৃতি বোঝা জরুরি। তাই দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে দেশভিত্তিক ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। ভাষা জানলে শুধু চাকরি পাওয়া সহজ হয় না, বেতনও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। ফলে একই সংখ্যক কর্মী থেকেও রেমিট্যান্স বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
মাদ্রাসা শিক্ষিত যুবকরা— অবহেলিত কিন্তু প্রস্তুত সম্পদ:
বাংলাদেশের একটি বড় অংশের যুবক মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে। তাদের অনেকের আরবি ভাষায় মৌলিক দক্ষতা রয়েছে, কিন্তু আধুনিক পেশাগত দক্ষতার অভাবে তারা কর্মসংস্থান থেকে বাদ পড়ে যায়। এ যুবকদের জন্য টার্গেটেড স্কিল আপগ্রেডেশন প্রোগ্রাম চালু করা গেলে—বিশেষ করে কেয়ার, সার্ভিস, কনস্ট্রাকশন ও হসপিটালিটি খাতে— তারা আরব দেশগুলোর শ্রমবাজারে দ্রুত যুক্ত হতে পারে। এতে সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত সামঞ্জস্যের কারণে কর্মীদের টিকে থাকার হারও বেশি হবে।
১০০ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স— ফর্মাল চ্যানেল ও প্রণোদনার প্রশ্ন:
রেমিট্যান্সের অঙ্ক বাড়ানো যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো রেমিট্যান্স কোন পথে দেশে আসছে। এখনও বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক বা হুন্ডি চ্যানেলে প্রবাহিত হয়। ফর্মাল ব্যাংকিং ও ডিজিটাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে নগদ প্রণোদনার পাশাপাশি করছাড়, দ্রুত সেবা, রিটার্নি উদ্যোক্তাদের জন্য অগ্রাধিকারমূলক ঋণ এবং ডিজিটাল লেনদেন সহজীকরণ জরুরি। এতে রিজার্ভ শক্তিশালী হবে এবং রেমিট্যান্স বিনিয়োগে রূপ নেয়ার সুযোগ বাড়বে।
রিটার্নি উদ্যোক্তা, এসএমই ও সার্কুলার ইকোনমি:
বিদেশফেরত কর্মীদের যদি পরিকল্পিতভাবে এসএমই উদ্যোক্তায় রূপান্তর করা যায়, তবে এক জন কর্মী মানেই তিন থেকে পাঁচটি নতুন চাকরি। এভাবেই রেমিট্যান্স → ব্যবসা → কর্মসংস্থান → আয় → পুনরায় দক্ষতা—এ সার্কুলার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট গড়ে উঠবে।
ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি— শর্তসাপেক্ষ বাস্তবতা:
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৫০ বিলিয়ন ডলার। দক্ষতাভিত্তিক মানবসম্পদ, এসএমই স্কেলিং, ফর্মাল রেমিট্যান্স ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান—এ চারটি স্তম্ভ শক্ত হলে ২০২৬–২০৩০ সময়কালে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে যাত্রা কল্পনা নয়।
শেষ কথা:
দক্ষতা উন্নয়ন দয়া নয়।
কর্মসংস্থান দয়া নয়।
রেমিট্যান্সও দয়া নয়।
এগুলো মানুষের ওপর বিনিয়োগ। বাংলাদেশ যদি তার যুবসমাজকে বোঝা না ভেবে সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে, তবে এ দেশ শুধু উন্নয়ন করবে না—নিজের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিজেই নির্মাণ করবে।
লেখক
শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান কর্মী
ড্যাফোডিল গ্রুপ সিইও।




























