Sobar Desh | সবার দেশ অমৃতা ইশরাত


প্রকাশিত: ১৩:৩৬, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

আপডেট: ১৮:৫৫, ১৪ এপ্রিল ২০২৬

আমি একটু আমার সঙ্গে দেখা করতে চাই

আমি একটু আমার সঙ্গে দেখা করতে চাই
ছবি: সবার দেশ

মানুষ নিজের সম্পর্কে যা জানে, তার চেয়ে অনেক বেশি সে লুকিয়ে রাখে নিজের কাছেই। এ লুকোনো অংশটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি ভাবিয়েছে—আর সে ভাবনার পথ ধরেই একসময় আমি পৌঁছে যাই কার্ল ইয়ুংয়ের (১৮৭৫-১৯৬১) দর্শনের কাছে। তিনি শুধু মানুষের মন ব্যাখ্যা করেননি, এমন এক আয়না তুলে ধরেছেন; যেখানে তাকালে নিজেকে এড়িয়ে যাওয়ার আর কোনও উপায় থাকে না।

আমাদের প্রত্যেকেরই একটা পারসোনা আছে (কানিজ আলমাসের বিউটি পার্লার নয় কিন্তু, এটা ইয়ুংয়ের একটা মনস্তাত্ত্বিক টার্ম)—একটা সামাজিক মুখোশ। আমরা প্রতিদিন সে মুখোশ পরে থাকি—কাজের জায়গায়, সম্পর্কের ভেতরে, এমনকি নিজের কাছেও। আমরা প্রায়শই শান্ত, সংযত, যুক্তিসংগত—এ পরিচয়টাকে যত্ন করে গড়ে তুলি। কিন্তু এ গড়নের আড়ালে যে অস্থিরতা, হঠাৎ রাগ, কিংবা অস্বীকার করা আকাঙ্ক্ষাগুলো লুকিয়ে থাকে—সেগুলো কি সত্যিই হারিয়ে যায়? না, একদমই হারায় না। সেগুলোই 'শ্যাডো' হয়ে জমা হয়।

ইয়ুংয়ের শ্যাডো (Shadow) ধারণাটা বুঝতে গিয়ে আমি নিজের অনেক আচরণের ব্যাখ্যা পেয়েছি। কেনো হঠাৎ কিছু মানুষকে অপছন্দ হয়, কেনো অকারণে বিরক্তি জন্মায়, কিংবা কেনো কিছু সম্পর্ক আমাকে অস্বস্তিকরভাবে আকর্ষণ করে—এসব প্রশ্নের উত্তর যেনো ওই ছায়ার মধ্যেই লুকিয়ে ছিলো। আমরা যেসব দিক নিজের মধ্যে স্বীকার করতে চাই না, সেগুলোই অন্যের মধ্যে দেখলে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। তখন বুঝলাম, আমার বিচারগুলো আসলে বাইরের মানুষকে নিয়ে নয়—আমার নিজের অস্বীকার করা অংশগুলোকেই আমি দেখছি।

এ উপলব্ধি খুব আরামদায়ক নয়, মেনে নিতে গেলে একধরনের অস্বস্তি, লজ্জা ও শূন্যতা কাজ করে। তবে এখানেই ইয়ুংয়ের দর্শন আমাকে একটা গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—নিজেকে সম্পূর্ণ করতে চাইলে নিজের অন্ধকার দিকটাকেও স্বীকার করতে হবে। শ্যাডোকে অস্বীকার করলে তা আরও বিকৃত হয়ে ফিরে আসে, কিন্তু গ্রহণ করলে সে ধীরে ধীরে শক্তি হয়ে ওঠে।

এ জায়গা থেকেই শুরু হয় ইন্ডেভিজুয়েশন (Individuation)—নিজেকে সত্যিকারের জানা ও গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। এটা রাতারাতি ঘটবে এমন কোনও বিষয় নয়, বরং ধীরে ধীরে নিজের ভেতরের দ্বন্দ্বগুলোকে চিনে নেয়ার, মেনে নেয়ার, আর একসাথে বয়ে নিয়ে যাওয়ার এক দীর্ঘ ক্লান্তিকর যাত্রা। আমি যখন নিজের কিছু দুর্বলতা মেনে নিতে শিখেছি—যেমন হঠাৎ রেগে যাওয়া, আবেগপ্রবণ হয়ে পড়া, অপ্রত্যাশিত টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাওয়া পরবর্তীতে অপরাধবোধে ভোগা—তখন বুঝেছি, সচেতনভাবে এগুলোর সাথে বোঝাপড়া থাকলে ভেতর থেকে বেশ শান্ত আর স্থির থাকা যায়। 

আরও পড়ুন <<>> ধর্ষণ, হত্যা ও আমাদের দায়

ইয়ুং বলেন, আমাদের অবচেতন শুধু ব্যক্তিগত নয়, এর একটি গভীর স্তর আছে—সমষ্টিগত অবচেতন (Collective Unconscious)। আগে এ ধারণাটা আমার কাছে খুব বিমূর্ত লাগত। কিন্তু যখন দেখি, ভিন্ন ভিন্ন জীবনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও মানুষের ভেতরের অনুভূতিগুলো সাথে অদ্ভুত মিল—ভয়, ভালোবাসা, হারানোর ব্যথা, কিংবা অর্থ খোঁজার আকাঙ্ক্ষা—তখন মনে হয়, আমরা সত্যিই কোনও এক বৃহত্তর অভিজ্ঞতার অংশ। আমার ব্যক্তিগত কষ্ট বা বিভ্রান্তি সবসময় একক নয়, এগুলো মানবিক অভিজ্ঞতারই অংশ।

স্বপ্ন নিয়েও আমার আগ্রহ ছিলো, কিন্তু কখনও গুরুত্ব দিয়ে ভাবিনি। ইয়ুংয়ের লেখা পড়বার পর বুঝলাম, স্বপ্ন আসলে এমন এক ভাষা, যা সরাসরি যুক্তিতে ধরা পড়ে না। কিছু স্বপ্ন পরে মনে করলে দেখি, সেগুলো আমার ভেতরের কোনও চাপা অনুভূতির ইঙ্গিত দিচ্ছিলো—যা জেগে থাকা অবস্থায় আমি স্বীকার করতে চাইনি বা এড়িয়ে গিয়েছি। যেনো অবচেতন নিজেই নিজের গল্প বলার চেষ্টা করছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটা আমি ইয়ুং থেকে শিখেছি, তা হলো—নিজেকে বোঝা মানে শুধু নিজের ভালো দিকগুলোকে লালন করা নয় বরং নিজের অস্বস্তিকর, অন্ধকার, এমনকি বিভ্রান্ত অংশগুলোকেও জায়গা দেয়া। কারণ মানুষ কোনও একরঙা সত্তা নয়, জটিল বহুস্তরবিশিষ্ট বাস্তবতা।

এ উপলব্ধি আমাকে আরও সহনশীল করেছে—নিজের প্রতি, অন্যদের প্রতিও। এখন আমি কাউকে বিচার করতে গেলে একটু থেমে ভাবি—এ অনুভূতিটা কি সত্যিই ওই মানুষটার জন্য, নাকি আমার নিজের কোনও অচেনা অংশের প্রতিফলন?

সত্যি বলতে কার্ল ইয়ুংয়ের দর্শন আমার কাছে একাডেমিক তত্ত্ব নয়। ব্যক্তিগত পথনির্দেশ—যেখানে প্রতিটি অস্বস্তি, প্রতিটি দ্বন্দ্ব, এমনকি প্রতিটি ভুলও নিজেকে নূতন করে জানার সুযোগ দেয়। এ পথ সহজ নয়, কিন্তু এটা সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যায়—আর সে সত্যটাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে প্রয়োজন। যেমনটা রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন—'আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্যসুন্দর...'

লেখক: ব্যাংকার

সম্পর্কিত বিষয়:

শীর্ষ সংবাদ:

ধূমপান করতে হাত কাঁপছিলো, লজ্জা লাগছিলো: বিদ্যা
এলপিজি ব্যবসায়ীদের ধর্মঘট প্রত্যাহার
অসুস্থতার কারণে ক্যাম্পাস ছেড়েছি,সুস্থ হয়েই ফিরবো: চুয়েট ভিসি
বাংলাদেশের তরুণরা আমাদের পথ দেখিয়েছে: নেহা বোরা
টঙ্গীর ওষুধ কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে: ফায়ার সার্ভিস
টঙ্গীর আগুন নিয়ন্ত্রণে ২১ ইউনিটের সঙ্গে সেনাবাহিনী-বিজিবি
১৬ ইউনিটেও নিয়ন্ত্রণে আসেনি ওষুধ কারখানার আগুন
টঙ্গীতে ওষুধ কারখানায় আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৮ ইউনিট
ফিটনেসবিহীন গাড়ির চালকের আসনে তারেক রহমান: হাসনাত
ড. ইউনূসকে হেনস্তা, ৪ আওয়ামী জঙ্গি শনাক্ত
এনসিপির শীর্ষ চার পদ বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত, বদলাচ্ছে নেতৃত্ব
ড. ইউনূসকে হেনস্তা, ১২ সাবেক উপদেষ্টার নিন্দা
মুচলেকা দিয়ে পুলিশি পাহারায় ক্যাম্পাস ছাড়লেন চুয়েট ভিসি
ড. ইউনূসের হেনস্তার দায় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর: নাহিদ
যুক্তরাষ্ট্রে ড. ইউনূসকে হেনস্তা, সরকারের নিন্দা
ড. ইউনূস ভালো আছেন, কোনও ক্ষতি হয়নি: লামিয়া মোরশেদ
মোদিবিরোধী আন্দোলনে বাজলো হাসিনাবিরোধী প্রতিবাদী গান
পাখি আমদানির আড়ালে শত কোটি টাকা পাচার
ওয়ান ব্যাংকে অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়োগ