ধর্ষণ, হত্যা ও আমাদের দায়
বাংলাদেশে নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে যৌন সহিংসতার ঘটনা নূতন নয়। তবু্ও এমন খবর সামনে এলে আমরা প্রতিবারই বিস্মিত হই। বিস্ময় ক্ষোভে বদলায়, ক্ষোভ শোকসভায়, শোক মিডিয়ায় প্রতিবাদে—তারপর ধীরে ধীরে নীরবতায়। এ চক্রটাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ঘটনাগুলো আলাদা হলেও সমাজবাস্তবতা একই থাকে।
সীতাকুণ্ড ইকো পার্কে ঘটে যাওয়া এ নির্মম সহিংসতা দেখলেই বোঝা যায়, দেশে শিশু নিরাপত্তার বিষয়টি একটা সামাজিক ভ্রম, যা আমরা নিজেদের সান্ত্বনার জন্য তৈরি করে রেখেছি। বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যান ভিন্ন হলেও বাস্তবতা আশ্চর্যভাবে এক—নারী ও শিশু সহিংসতার সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী। যুদ্ধক্ষেত্রে, শরণার্থী শিবিরে, কর্মস্থলে, এমনকি ঘরের ভেতরেও তারা নিরাপত্তাহীন। এ সহিংসতার শিকড় কোনও ভূখণ্ডে নয় বরং ক্ষমতার সার্বজনীন মানসিক কাঠামোয় প্রোথিত।
ধর্ষণ বা যৌন সহিংসতাকে বেশিরভাগ মানুষ যৌনতার বিকৃত রূপ বলেই জানে। তবে আধুনিক সমাজতত্ত্ব অন্য কথা বলে। এটা মূলত ক্ষমতার ভাষা। সুচিন্তক মিশেল ফুকো দেখিয়েছেন—ক্ষমতা আমাদের দৈনন্দিন সম্পর্কের ভেতরে ছড়িয়ে থাকে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সে ক্ষমতাকে এমনভাবে বিন্যস্ত করে রেখেছে যে নারী ও শিশুকে সহজেই নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে মনে করা হয়। যখন কোনও ব্যক্তি নিজেকে হীনমন্য, ব্যর্থ কিংবা অদৃশ্য মনে করে, তখন সে সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণীকে আঘাত করে। তার কাছে প্রাধান্য প্রতিষ্ঠাই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। ধর্ষণের পর হত্যা আধিপত্যের একটি চরম রূপ।
অপরাধমনোবিজ্ঞান বলছে, এমন অপরাধীরা প্রায়শই নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয় ও ক্ষমতার ভ্রান্ত বোধ থেকে কাজ করে। তারা মনে করে, অন্যের জীবন ও শরীরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের উপায়। এ বিকৃত আত্মমর্যাদা কখনও কখনও সহিংসতায় রূপ নেয়।
মনোবিশ্লেষণের একটি ধারায় ফ্রয়েড অবদমিত প্রবৃত্তির কথা বলেছেন। কিন্তু সামাজিক বাস্তবতায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো ‘শেখানো মানসিকতা’। ছেলেদেরকে আমরা কতটা সম্মতি, সমতা ও সংযম শেখাই? কতটা শেখাই প্রত্যাখ্যান মেনে নিতে? এদিকে মেয়েদেরকে দ্রুত শিখিয়ে দিই সতর্কতা—‘ওখানে যেতে নেই’, ‘ওভাবে পোশাক পরতে নেই’, ‘নিজের অনুভূতি প্রকাশ্যে বলতে নেই’ ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলত নিরাপত্তার দায় স্থানান্তরিত হয় ভুক্তভোগীর দিকে, অপরাধীর দিকে নয়।
আরও পড়ুন <<>> মাতৃভাষা: মনস্তত্ত্ব, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়
শিশুর ক্ষেত্রেও একই স্ট্রাকচার কাজ করে। শিশুরা সহজে প্রতিবাদ করতে পারে না, ক্ষমতার ভারসাম্য বোঝে না, সামাজিক লজ্জার ভাষা জানে না। বিশ্বজুড়ে শিশু নির্যাতনের বহু ঘটনা প্রমাণ করে—অপরাধী অনেক সময় পরিবারের ভেতরেই থাকে। অনেক সময় আমরা পরিবারের প্রবীণ সদস্য, প্রতিবেশি কিংবা নিকটাত্মীয়ের কাছে সরল বিশ্বাসে শিশুদের ছেড়ে দিই। প্রৌঢ় মানেই প্রজ্ঞা—এ ধারণাটি সাংস্কৃতিক রোমান্টিকতা। মানুষের মানসিক গঠন যদি সমতার চর্চায় নির্মিত না হয়, তবে তার বয়স কেবল সংখ্যায় বাড়ে, নৈতিকতায় নয়। বিপদ সবসময় অপরিচিত নয়, পরিচিত মুখও হতে পারে।
গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়, সহিংসতার পুনরাবৃত্তি সমাজে এক ধরনের অসাড়তা তৈরি করে। আমরা ক্ষুব্ধ হই, শোক জানাই, তারপর ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে যাই। এ অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া বিপজ্জনক। কারণ এটা অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলে না। নীরবে মেনে নেয়ার একটা অবজেক্টিভ কন্ডিশন তৈরি করে—যেনো এটা অনিবার্য ছিলো।
সহিংসতা অনিবার্য নয়, শেখানো মানসিকতার ফল। তাই সমাধানও শুধু শাস্তিতে সীমাবদ্ধ হতে পারে না। কঠোর আইন অবশ্যই জরুরি, তার আগে প্রয়োজন মানসিক শিক্ষা। পরিবারে সমতার চর্চা, স্কুলে সম্পর্ক ও সম্মতিভিত্তিক পাঠক্রম, কর্মক্ষেত্রে জবাবদিহিতা—এ বিষয়গুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারলে অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে। সেসাথে পুরুষদের আবেগ প্রকাশের জায়গা তৈরি করা দরকার, যাতে করে হতাশা বা হীনমন্যতা বিকৃতি দিয়ে শেষ না হয়।
একটা মেয়েকে পার্কে যেতে হলে, একটা শিশুকে স্কুলে যেতে হলে মাথায় নিরাপত্তার অঙ্ক কষতে হবে কেনো? নারী-শিশু বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে এই নয় যে রাষ্ট্র তাদের প্রতি কোনও অনুগ্রহ দেখাচ্ছে, এটা মানবতার ন্যূনতম শর্ত। যতদিন পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত না হবে, ততদিন উন্নয়ন, উৎকর্ষ, আধুনিকতা—সব শব্দই অপূর্ণ থেকে যাবে।
লেখক: ব্যাংকার




























