এক সাক্ষাৎকারে বদলে যাওয়া বাস্তবতা
তারেক রহমান ও দক্ষিণ এশিয়ার নতুন মেরুকরণ
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত একটি সাক্ষাৎকার যেন পুরো কূটনৈতিক গতিপথকেই নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাৎকার শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য ছিলো না, এটি ছিলো একটি স্ট্র্যাটেজিক পলিটিক্যাল মেসেজ। যা দেশীয় রাজনীতির সীমানা পেরিয়ে আঞ্চলিক শক্তিগুলোকেও নাড়া দিয়েছে।
ভারতের ব্যাকডোর মেসেজ:
বিশ্বস্ত কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি গোপন বার্তা (Backdoor Message) পাঠানো হয়। বার্তাটির মূল বক্তব্য ছিলো
যদি বাংলাদেশের পরবর্তী সরকার গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়, তবে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে আরও উন্নত ও পারস্পরিক স্বার্থনির্ভর হবে।
এ বার্তার সঙ্গে যুক্ত ছিলো কিছু কৌশলগত প্রস্তাব:
মিলিটারি ডিপ্লোমেসি ও ইন্টেলিজেন্স ট্রেনিং সহযোগিতা, দুটি এক্সক্লুসিভ ইকোনোমিক জোন স্থাপনের প্রতিশ্রুতি, তিস্তা ইস্যুতে ভারতের ‘লোকাল সলিউশন’ প্রস্তাব, শিক্ষা, কৃষি ও ফার্মাসিউটিক্যাল সেক্টরে যৌথ বিনিয়োগ, টেরোরিজম ও বর্ডার সিকিউরিটিতে যৌথ উদ্যোগ, R&D এবং স্পেস টেকনোলজি পার্টনারশিপের প্রস্তাব। এ অফারগুলোর উদ্দেশ্য ছিলো স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে আসন্ন রাজনৈতিক রদবদলের ক্ষেত্রে ভারতের কৌশলগত প্রভাব অটুট রাখা।
বিএনপির অনমনীয় অবস্থান:
অন্যান্য অনেক দলের নরম অবস্থানের বিপরীতে বিএনপি। বিশেষত তারেক রহমান এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। দলের ভেতর থেকেও কেউ কেউ আপোষের পক্ষে থাকলেও, তারেক রহমান দৃঢ়ভাবে অবস্থান নেন বাংলাদেশের সার্বভৌম নীতি ও জাতীয় স্বার্থ বিদেশি স্বার্থের কাছে বিক্রয়যোগ্য নয়। এ অবস্থান ভারতের জন্য ছিলো একেবারেই অপ্রত্যাশিত। তাই কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবে পুনরায় পার্বত্য অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা শুরু হয়। ইতিহাস বলে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বরাবরই ভারতের একটি ‘লেভারেজ টুল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা রাজনৈতিক বার্তা পাঠানোর একটি কার্যকর উপায়।
আরও পড়ুন <<>> ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড: সম্ভাবনার পথে বাংলাদেশ
তারেক রহমানের বিবিসি সাক্ষাৎকারটি ছিলো নিঃসন্দেহে প্রি-প্ল্যান্ড ও টেস্ট-কেস। প্রশ্নের ধারা ও ভাষা ইঙ্গিত দিচ্ছিলো যে, উদ্দেশ্য ছিলো তাকে বেকায়দায় ফেলা। কিন্তু তারেক রহমান প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ঠাণ্ডা মাথায়, বিশ্লেষণাত্মকভাবে এবং রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয় দিয়ে।
সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে-
বিএনপি ভারতের প্রভাবাধীন রাজনীতি বা আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ মেনে নেয় না; বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত শুধু বাংলাদেশের জনগণের। এ বক্তব্য শুধু একটি দলীয় অবস্থান নয়; এটি ছিলো বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাজনৈতিক ঘোষণাপত্র।
পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও রাজনৈতিক লেভারেজ:
সাক্ষাৎকার প্রচারের দুই দিনের মাথায় হঠাৎই আমরা লক্ষ্য করি যে, বিএনপি নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে বিচারিক অগ্রগতি ও মামলার তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি পলিটিক্যাল প্রেসার মেকানিজম, যা মূলত কূটনৈতিক বার্তাকে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ায় রূপ দেয়ার প্রয়াস। কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাস সাক্ষী, যে শক্তি জনগণের পক্ষে দাঁড়ায় এবং বিদেশি আধিপত্যের বিপক্ষে অবস্থান নেয়, শেষ পর্যন্ত জনসমর্থন তার পক্ষেই ফিরে আসে।
বাংলাদেশ এখন এক ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। আগামী কয়েক মাসের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে আরও অনেক ‘চমক’ দেখা দিতে পারে। তবু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে এ জাতির আত্মা স্বাধীন, এ মাটির মেরুদণ্ড ভাঙা যায় না।
আজ যারা বিষ ঢালছে, কাল তারাই ব্যুমেরাংয়ের শিকার হবে। কারণ জনগণের ইচ্ছাই এ দেশের চূড়ান্ত শক্তি।
লেখক:
মো. হাবিবুর রহমান
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।




























