Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০২:০৬, ২৩ জুন ২০২৬

যে বিশ্বাসঘাতকতা বদলে দিয়েছিলো বাংলার ইতিহাস

পলাশী ট্র্যাজেডি দিবস আজ

পলাশী ট্র্যাজেডি দিবস আজ
ফাইল ছবি

আজ ২৩ জুন, ঐতিহাসিক পলাশী ট্র্যাজেডি দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এটি এক বেদনাবিধুর, শোকাবহ এবং একই সঙ্গে শিক্ষণীয় দিন। ২৬৯ বছর আগে ১৭৫৭ সালের এ দিনে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে সংঘটিত হয়েছিলো এমন এক যুদ্ধ, যার ফলাফল শুধু বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রই বদলে দেয়নি; বরং পুরো ভারতীয় উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিয়েছিলো।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম পলাশীর পরাজয়কে স্মরণ করে লিখেছিলেন— 

পলাশী! হায় পলাশী! এঁকে দিলি তুই জননীর বুকে কলঙ্ক কালিমা রাশি।

ইতিহাসের পাতায় এ যুদ্ধ তাই শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়; এটি ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার লড়াই, বিদেশি আধিপত্য এবং জাতীয় বিপর্যয়ের প্রতীক হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে আছে।

ইতিহাসবিদদের মতে, পলাশীর যুদ্ধ ছিলো মূলত বাংলার স্বাধীনতা রক্ষাকারী শক্তি এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সম্প্রসারণবাদী শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ। তবে যুদ্ধক্ষেত্রে যতটা না সামরিক শক্তির লড়াই হয়েছিলো, তার চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলেছিলো রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা।

আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাংলা ছিলো বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। মসলিন, রেশম, নীল, মসলা ও কৃষিপণ্যের কারণে বাংলাকে তৎকালীন বিশ্বের ধনী অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ইউরোপীয় বণিকরা বাংলার বাণিজ্যিক সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট ছিলো। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে ব্যবসার উদ্দেশ্যে এলেও ধীরে ধীরে তারা রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হয়।

১৭৫৬ সালে বাংলার নবাব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তরুণ নবাব সিরাজউদ্দৌলা। তিনি ব্রিটিশদের ক্রমবর্ধমান সামরিক কর্মকাণ্ড এবং দুর্গ নির্মাণের বিরোধিতা করেন। এর ফলে নবাবের সঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। কিন্তু এ বিরোধের সুযোগ নেয় নবাব দরবারের একাংশ।

ইতিহাসের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, সেনাপতি মীর জাফর, ধনকুবের জগৎশেঠ পরিবার, উমিচাঁদ, রায়দুর্লভসহ প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যক্তি গোপনে ব্রিটিশদের সঙ্গে সমঝোতায় জড়িয়ে পড়েন। তাদের প্রত্যাশা ছিলো, সিরাজউদ্দৌলার পতনের পর তারা নিজেদের ক্ষমতা ও প্রভাব আরও বাড়াতে পারবেন।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভোরে পলাশীর আম্রকাননে যুদ্ধ শুরু হয়। একদিকে নবাব সিরাজউদ্দৌলার প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য, বিপুল অশ্বারোহী বাহিনী ও কামান ছিলো। অন্যদিকে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সৈন্যসংখ্যা ছিলো তুলনামূলকভাবে অনেক কম।

তবে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যায় যখন নবাবের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর এবং তার অনুগত বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্ক্রিয় থাকে। নবাবের পক্ষে মীর মদন, মোহনলাল ও কয়েকজন বিশ্বস্ত সেনানায়ক প্রাণপণ লড়াই চালিয়ে যান। মীর মদন যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হলে নবাবপক্ষের মনোবল দুর্বল হয়ে পড়ে।

বৃষ্টিতে নবাব বাহিনীর কামানের বারুদ ভিজে যাওয়ার ঘটনাও যুদ্ধের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছিলো বলে অনেক ঐতিহাসিক উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ব্রিটিশরা তাদের গোলাবারুদ সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়। শেষ পর্যন্ত ষড়যন্ত্র, নেতৃত্বের সংকট এবং বিশ্বাসঘাতকতার কারণে নবাব বাহিনী পরাজিত হয়।

যুদ্ধের পর সিরাজউদ্দৌলা মুর্শিদাবাদে ফিরে নতুন করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু রাজনৈতিক সমর্থন হারিয়ে তিনি পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। পরে তাকে গ্রেফতার করা হয় এবং মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে হত্যা করা হয়।

পলাশীর যুদ্ধের পর মীর জাফরকে বাংলার নবাব করা হলেও প্রকৃত ক্ষমতা চলে যায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই কোম্পানি বাংলার রাজস্ব, প্রশাসন ও অর্থনীতির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট শাহ আলমের কাছ থেকে বাংলার দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে ব্রিটিশ আধিপত্য আরও সুসংহত হয়।

ঐতিহাসিকদের মতে, পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়। বাংলার বিপুল সম্পদ ব্রিটেনে স্থানান্তরিত হতে থাকে। অনেক গবেষক মনে করেন, ব্রিটিশ শিল্পবিপ্লবের পেছনে বাংলার অর্থনৈতিক সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিলো।

তবে পলাশীর পরাজয় বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে নিভিয়ে দিতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলন, তিতুমীরের সংগ্রাম, ফরায়েজি আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ এবং ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহসহ একের পর এক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে।

অবশেষে ১৯৪৭ সালে প্রায় ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে। কিন্তু বাঙালির স্বাধীনতার সংগ্রাম তখনও শেষ হয়নি। ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার আন্দোলন এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।

ইতিহাসবিদরা মনে করেন, পলাশী ট্র্যাজেডির সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো— কোনও জাতির জন্য অভ্যন্তরীণ বিভক্তি, ক্ষমতার লোভ এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। পলাশীর পরাজয় তাই কেবল অতীতের একটি ঘটনা নয়; এটি জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক সতর্কতার এক চিরন্তন বার্তা।

২৬৯ বছর পরও পলাশীর নাম উচ্চারিত হয় বেদনা, আত্মসমালোচনা ও শিক্ষা গ্রহণের প্রতীক হিসেবে। ইতিহাসের সে রক্তাক্ত দিন আজও বাঙালিকে স্মরণ করিয়ে দেয়— একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি ষড়যন্ত্র কিংবা কিছু মানুষের ক্ষমতালিপ্সা কখনও কখনো একটি জাতির ভাগ্য বদলে দিতে পারে।

লেখক ও সংবাদকর্মী

শীর্ষ সংবাদ:

গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার শুরু হয়েছে: প্রধানমন্ত্রী
সংসদমুখী পদযাত্রায় ১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বান
মিরাজ নিখোঁজে ‘গুমের কাহিনী’ সাজানোর চেষ্টা হতে পারে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
রংপুরে চার খুন হত্যায় সিদ্ধার্থের বাবা-ভাই ডিবি হেফাজতে
আ.লীগ ফেরার বাতাস শুধু ভারত-সোশ্যাল মিডিয়ায়: সারজিস
ঝুলন্ত সেতু পানিতে তলিয়ে চলাচল বন্ধ রাঙামাটিতে
পাকিস্তানে তুর্কি সামরিক বিমানের আনাগোনা, উদ্বিগ্ন ভারত
২৪ ঘণ্টায় বন্যার শঙ্কায় দুই জেলা
নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে তৃতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা
গুমের প্রতিটি ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত ও বিচার চান নাহিদ
কাপ্তাই বাঁধের ১৬ জলকপাট খুলে পানি নিষ্কাশন
আইফোন ১৮ প্রো সিরিজ আসছে সেপ্টেম্বরে, থাকছে যেসব ফিচার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদ্রাসাশিক্ষকদের সঙ্গে এনসিপি নেতাদের সাক্ষাৎ
সরে দাঁড়ালো কওমি, এনসিপির অনুষ্ঠানের এবার বাধা হলো প্রশাসন
লাশের পাহাড় নেপাল, মর্গে ঠাঁই নেই
দুঃখ প্রকাশ করলেন হাসনাত আবদুল্লাহ