Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০০:১৬, ২৭ জুন ২০২৬

আপডেট: ০০:১৭, ২৭ জুন ২০২৬

চীনের নতুন অর্থনৈতিক করিডোর, চাপে পড়ছে ভারত?

চীনের নতুন অর্থনৈতিক করিডোর, চাপে পড়ছে ভারত?
ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। একসময় যে অঞ্চলকে ভারত তার স্বাভাবিক কৌশলগত প্রভাব বলয় হিসেবে বিবেচনা করতো, সেখানে এখন ক্রমেই শক্ত অবস্থান তৈরি করছে চীন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফর, একাধিক অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সমঝোতা, তিস্তা প্রকল্পে নতুন গতি, সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, পাকিস্তান ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে নয়াদিল্লির জন্য নতুন এক কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিষয়টি শুধু বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের উন্নয়ন নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সফরে অবকাঠামো, বাণিজ্য, শিল্প, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষি ও যোগাযোগ খাতে একাধিক সমঝোতা হয়। বিশেষ করে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে তিস্তা প্রকল্পে চীনের আগ্রহ থাকলেও ভারতের আপত্তির কারণে সেটি এগোয়নি। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রকল্পটি আবারও সামনে চলে এসেছে। যদি চীনের অর্থায়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়, তাহলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি, সেচ, পানি ব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। একই সঙ্গে এটি ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বার্তাও বহন করবে।

তাছাড়া সম্পতি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চীনের তৈরি ২০টি অত্যাধুনিক জে-১০সিই (J-10CE) মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এ সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তিকে শুধু সামরিক আধুনিকায়নের অংশ হিসেবেই নয়, বরং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছে সংশ্লিষ্ট মহল।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের লক্ষ্য শুধু একটি প্রকল্প নয়; বরং বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত একটি বিস্তৃত অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলা। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় ইতোমধ্যে পাকিস্তানের সিপিইসি, মিয়ানমারের চীন-মিয়ানমার করিডোর, মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন সংযোগ প্রকল্প এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রেল ও বন্দর উন্নয়নের মাধ্যমে বেইজিং একটি বিশাল অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক তৈরি করছে। বাংলাদেশ সে নেটওয়ার্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার, উত্তর-পূর্ব ভারতের কাছাকাছি অবস্থান এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ—সব মিলিয়ে ঢাকা এখন বেইজিংয়ের কৌশলগত পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

অন্যদিকে, প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যে চীনের তৈরি বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে। নতুন যুদ্ধবিমান সংগ্রহ বা প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। কারণ, ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের কাছাকাছি চীনের প্রতিরক্ষা উপস্থিতি বাড়ার আশঙ্কা নয়াদিল্লির জন্য দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

একই সময়ে ভারতের প্রতিবেশী সম্পর্কও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। পাকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতা অব্যাহত রয়েছে। নেপাল ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত ইস্যু এখনও পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি। মালদ্বীপ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে। শ্রীলঙ্কা অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও চীনা বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা কমাতে পারেনি। বাংলাদেশেও যদি চীনের প্রভাব আরও গভীর হয়, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঐতিহ্যগত কৌশলগত অবস্থান আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাও এ সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের পর আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিভিন্ন বিশ্লেষক মনে করছেন, দীর্ঘ সংঘাতের পর পশ্চিমা জোটের কৌশলগত সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে এবং চীন ও রাশিয়া নিজেদের প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছে। যদিও যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের ভিন্ন ভিন্ন মূল্যায়ন রয়েছে, তবুও সংঘাতটি আন্তর্জাতিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।

ভারত একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোয়াড জোটে সক্রিয়, অন্যদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাও ধারাবাহিকভাবে বাড়িয়েছে। ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা প্রযুক্তি ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে দুই দেশের সহযোগিতা এখন অনেক গভীর। এ ঘনিষ্ঠতা ভারতের জন্য প্রযুক্তিগত সুবিধা আনলেও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশের সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষা এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে বলে বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা দীর্ঘদিন ধরেই ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ নীতির কথা বলে আসছে। ফলে চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়লেও ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহত রাখা বাংলাদেশের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থনীতিবিদদের মতে, চীনা বিনিয়োগ, শিল্পাঞ্চল, রেল, বন্দর, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি ও উৎপাদন খাতে সহযোগিতা বাংলাদেশের শিল্পায়নকে নতুন গতি দিতে পারে। তবে ঋণ ব্যবস্থাপনা, প্রকল্পের স্বচ্ছতা, জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ এবং বহুমুখী কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হবে।

সব মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। চীনের অর্থনৈতিক করিডোর পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি যত বাড়বে, ভারতের কৌশলগত উদ্বেগও তত বাড়তে পারে। তবে এটিকে কেবল ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে পুরো চিত্রটি ধরা যাবে না। বরং এটি এমন একটি পরিবর্তন, যেখানে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের জাতীয় স্বার্থে বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সুযোগ পাচ্ছে। আগামী কয়েক বছরেই স্পষ্ট হবে—চীনের নতুন অর্থনৈতিক করিডোর সত্যিই দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয় কি না, নাকি ভারতও পাল্টা কৌশলে নিজের প্রভাব পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়।

লেখক ও সংবাদকর্মী

শীর্ষ সংবাদ:

ব্রাজিলের কাছে ক্ষমা চেয়ে জাপান কোচ বললেন ‘আর্জেন্টিনাই সেরা’
বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা ‘মামলার ব্যবসা’ করছেন: রুমিন ফারহানা
ভেনিজুয়েলায় ভূমিকম্পে প্রাণহানি ৫৮৯
সমর্থকদের সঙ্গে ফুটবল খেললেন আর্জেন্টাইন রাষ্ট্রদূত
দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বিএনপির পাশে থাকবে এনসিপি
বিশ্বকাপের ডাগআউটেও আর্জেন্টিনার দাপট
ভারতের ট্যুরিস্ট ভিসায় নতুন নিয়ম
লক্ষ্মীপুরে জানাজা শেষে মা ও তিন মেয়ের লাশ নেয়া হলো কুমিল্লায়
চীনের নতুন অর্থনৈতিক করিডোর, চাপে পড়ছে ভারত?
এই মিন্নি সেই মিন্নি, রিফাত হত্যার সাত বছর
বেইজিংয়ের সর্বোচ্চ ভবনে ধাক্কা খেয়ে উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত
চীন সফর শেষে দেশে ফিরলেন প্রধানমন্ত্রী
পাকিস্তানের আকাশসীমায় ঢুকে চাকরি খোয়ালেন এয়ার ইন্ডিয়ার পাইলট
১ টাকার দুর্নীতির প্রমাণ দিন, সংসদ থেকে ইস্তফা দেবো: সংসদে চ্যালেঞ্জ হাসনাত আবদুল্লাহর