‘হ্যাঁ অথবা না বলুন’—পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে হাসনাত
যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন কি না—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে ‘কে এটা নিয়ে নিউজ করেছে, কার এতো জ্বালা?’—এমন মন্তব্য করা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা ও সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।
সোমবার (২৪ আগষ্ট) রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেয়া এক পোস্টে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে প্রশ্নটি ছিলো খুবই সরল—তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ছেড়েছেন কি না। এর উত্তরও খুব সহজ—হ্যাঁ অথবা না।
হাসনাত বলেন, প্রতিমন্ত্রী যদি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ছেড়ে থাকেন, তাহলে তিনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেন। কিন্তু তা না করে জবাবদিহিতা এড়িয়ে অপেশাদার, ব্যঙ্গাত্মক ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করা হয়েছে। তার মতে, এ ধরনের আচরণ গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নতুন করে চাপ তৈরি করতে পারে।
হাসনাত তার পোস্টে প্রতিমন্ত্রীর সাংবাদিকদের উদ্দেশে করা বিভিন্ন মন্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে প্রতিমন্ত্রী তাচ্ছিল্যের সঙ্গে ‘কোন পত্রিকা ঠিক’, ‘কে এতো চিন্তিত’ কিংবা ‘তারা কি আবার ২০০৮ নিয়ে উত্তেজিত হয়ে পড়েছে’—এ ধরনের কথা বলেছেন। এমনকি মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন আমলের প্রসঙ্গও টেনেছেন।
এনসিপির এ নেতা প্রশ্ন তোলেন, এ ধরনের আচরণ দিয়ে একজন ব্যক্তি কীভাবে দেশের কূটনীতি সামলাবেন। তিনি বলেন, কূটনীতিকদের আচরণ সাধারণত বিনয়ী ও ভদ্র হওয়া প্রত্যাশিত। কোনও প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে হলেও কূটনৈতিক কৌশলে তা এড়িয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বরং তার নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলাকেই আক্রমণ করেছেন।
হাসনাত বলেন, সংবিধান, আইন ও বিধিবিধান সবার জন্য সমান। কোনও ব্যক্তির বিদেশি নাগরিকত্ব থাকলে তিনি সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হতে পারেন না। এনসিপির একজন নেতা এ কারণে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। সে সময় রাজনৈতিকভাবে কষ্ট পেলেও তারা আইনি বিধান মেনে নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন।
বিএনপির কয়েকজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে নির্বাচনের সময় বিদেশি নাগরিকত্বের তথ্য গোপনের অভিযোগও তোলেন হাসনাত। তিনি দাবি করেন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) তিনজনের কথা বললেও তার ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
তিনি বলেন, তথ্য গোপনের মতো অসততা করে কেউ সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী হতে পারলে তার পক্ষে ভবিষ্যতে আরও নানা ধরনের অসততা করা সম্ভব। তবে হুমায়ুন কবিরকে ব্যক্তিগতভাবে শত্রু মনে করেন না বলেও উল্লেখ করেন হাসনাত।
হাসনাত বলেন, হুমায়ুন কবির বহু বছর যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সহযোগী ছিলেন। সে কারণে প্রধানমন্ত্রী তার নাগরিকত্বের বিষয়টি জানতেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তার প্রশ্ন, প্রধানমন্ত্রী কি বিষয়টি জেনে-বুঝেই হুমায়ুন কবিরকে এ দায়িত্ব দিয়েছেন?
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের জবাবদিহিতা বাধ্যতামূলক উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, তারা হুমায়ুন কবিরের শাস্তি চাইছেন না। শুধু জানতে চাইছেন, তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ছেড়েছেন কি না। ছেড়ে থাকলে তার প্রমাণ কী—এ প্রশ্নের জবাব চেয়েছেন তিনি।
হাসনাতের ভাষ্য, প্রতিমন্ত্রী যদি এ প্রশ্নের উত্তর না দেন, তাহলে নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ আরও জোরালো হবে। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের ‘গরম চোখ’ দেখিয়ে ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশের অভিযোগও করেন তিনি।
আওয়ামী লীগের সাবেক দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রসঙ্গ টেনে হাসনাত বলেন, হাছান মাহমুদ বেলজিয়ামের এবং আবদুল মোমেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার দাবি, তারা এ তথ্য গোপন করে মন্ত্রিত্ব করেছেন এবং পরে ৫ আগস্টের পর নিজ নিজ দেশে চলে গেছেন। বাংলাদেশে একই ধরনের অসততার পুনরাবৃত্তি চান না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সাংবাদিকদের ব্যঙ্গ করা, তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে রাজনৈতিক ইঙ্গিত দেয়া এবং ২০০৮ ও মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীন আমলের প্রসঙ্গ টেনে আনা কোনোভাবেই একজন মন্ত্রীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত পেশাদার আচরণ নয়।
হাসনাত আরও বলেন, প্রতিমন্ত্রী এখনও মূল প্রশ্নটির কোনো স্পষ্ট ও তথ্যভিত্তিক জবাব দেননি। তার মতে, একজন মন্ত্রীর এমন আচরণ শুধু একজন সাংবাদিককে নিরুৎসাহিত করে না, এর প্রভাব পুরো সংবাদমাধ্যমের ওপর পড়ে। একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করতে ভয় পেলে পরবর্তী সময়ে অন্যরাও প্রশ্ন করার আগে ভাববেন, যা একপর্যায়ে ‘সেল্ফ-সেন্সরশিপ’ তৈরি করতে পারে।
অতীতে ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করা সাংবাদিকদের রাজনৈতিক তকমা দেয়া এবং তাদের ওপর চাপ তৈরির ঘটনা দেখা গেছে উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, নতুন সরকারের কাছ থেকে সে সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি প্রত্যাশিত নয়।
সবশেষে তিনি মন্তব্যের জন্য শুধু দুঃখপ্রকাশ নয়, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে তার নাগরিকত্বের বিষয়ে স্পষ্ট জবাব দেয়ার আহ্বান জানান।
হাসনাতের ভাষায়,
তিনি কী বিদেশি নাগরিক? হ্যাঁ অথবা না—বলুন।
সবার দেশ/কেএম




























