Sobar Desh | সবার দেশ আবু ইউসুফ


প্রকাশিত: ০৮:৫৫, ৭ আগস্ট ২০২৬

আপডেট: ০৯:১৩, ৭ আগস্ট ২০২৬

যেভাবে বদলে যায় বাংলাদেশের ইতিহাস

সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন

সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন
ছবি: সবার দেশ

[২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে অস্থির, রক্তাক্ত ও ঘটনাবহুল সময়গুলোর একটি। রাজপথজুড়ে বিক্ষোভ, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ, কারফিউ, ইন্টারনেট বন্ধ, একের পর এক প্রাণহানি—সব মিলিয়ে দেশ তখন কার্যত এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। ধারাবাহিক ফিচারের পাঁচ পর্বের প্রথম পর্ব আজ।]

প্রথম পর্ব

বাইরের দৃশ্য ছিলো একরকম। মনে হচ্ছিলো রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতিটি স্তর তখনও শেখ হাসিনা সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, নির্বিচার গুলি, গণগ্রেফতার এবং কঠোর দমন-পীড়নের কারণে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সরকার হয়তো আরও দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় টিকে থাকবে।

কিন্তু দৃশ্যপটের আড়ালে চলছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতা।

রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়, সেনা সদর, রাজনৈতিক দল, ছাত্রনেতৃত্ব এবং সুশীল সমাজ—সবখানেই তখন দ্রুত বদলে যাচ্ছিলো হিসাব-নিকাশ। এমন এক পরিবর্তনের প্রস্তুতি চলছিলো, যার পরিণতিতে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ভেঙে পড়ে টানা দেড় দশকেরও বেশি সময়ের ক্ষমতার কাঠামো।

এ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য শেখ হাসিনার দেশত্যাগের আগে ও পরে সরাসরি আলোচনায় যুক্ত থাকা পাঁচজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। তাদের বর্ণনায় উঠে এসেছে ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে কী ঘটেছিলো, কীভাবে নেয়া হয়েছিলো একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং কীভাবে গড়ে ওঠে অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা।

এ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ক্যান্টনমেন্টের গোপন বৈঠক, বঙ্গভবনের আলোচনার অন্তরালের ঘটনা, ছাত্রনেতাদের আপত্তি, রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, সেনাবাহিনীর ভূমিকা এবং শেষ পর্যন্ত অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে প্রধান উপদেষ্টা করার সিদ্ধান্তের পেছনের নেপথ্য কাহিনি।

যদিও সাক্ষাৎকারে উল্লেখিত সব ব্যক্তির বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি, তবুও এসব বিবরণ সে সময়কার ঘটনাপ্রবাহ বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসূত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গোপনে চলছিলো বিকল্প পরিকল্পনা

জুলাই আন্দোলনের শুরুতে ছাত্রনেতাদের প্রধান লক্ষ্য ছিলো সরকারকে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে চাপে ফেলা। অসহযোগ আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম অচল করে দেয়ার পরিকল্পনা কয়েক সপ্তাহ ধরেই গোপনে এগিয়ে নিচ্ছিলেন তারা।

তখনও তাদের ধারণা ছিলো, আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হবে। হয়তো আরও কয়েক সপ্তাহ কিংবা কয়েক মাস লাগতে পারে।

কিন্তু আগস্টের প্রথম সপ্তাহেই পরিস্থিতি এমন দ্রুত পাল্টে যায়, যা আন্দোলনের নেতৃত্বেও থাকা অনেকের কল্পনার বাইরে ছিলো।

সরকারের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দ্রুত দুর্বল হতে শুরু করে। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, প্রশাসনের মধ্যে অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক চাপ—সবকিছু মিলে ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলতে থাকে।

৫ আগস্টের সেই ফোনকল

৫ আগস্ট রাত ১২টা ২০ মিনিট।

দেশজুড়ে তখনও থমথমে পরিস্থিতি। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ অব্যাহত। সে সময় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান ফোন করেন বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) ফজলে এলাহী আকবরকে।

সেনাপ্রধান তাকে পরদিন সকালে নিজের বাসভবনে দেখা করার অনুরোধ জানান।

ফজলে এলাহী আকবরের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল ১০টার দিকে সেনাপ্রধানের বাসভবনে বৈঠক শুরু হয় এবং প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে চলে।

সেখানে সেনাপ্রধান নাকি স্পষ্টভাবে বলেন, চলমান রাজনৈতিক সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজতে তিনি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করতে চান।

ফজলে এলাহী আকবরের ভাষ্যমতে, সেনাপ্রধান তাকে দায়িত্ব দেন যত দ্রুত সম্ভব প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের একত্রিত করার, যাতে ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা যায়।

তিনি পরে স্মরণ করেন, বৈঠক শেষ হওয়ার আগে সেনাপ্রধান জানান, ভারতীয় সেনাপ্রধান তার সঙ্গে যোগাযোগ করবেন। এরপর কফি খাওয়ার সময়ই বৈঠকের সমাপ্তি ঘটে।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ

সেনাপ্রধানের বাসভবন থেকে বেরিয়েই ফজলে এলাহী আকবর প্রথমে ফোন করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, মির্জা ফখরুল আলোচনার উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেন এবং দলীয় নেতৃত্বের সঙ্গে পরামর্শ করার আশ্বাস দেন।

তবে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সহজ ছিলো না। সে সময় অনেকেই আত্মগোপনে থেকে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করতে দীর্ঘ সময় লেগেছিলো বলে জানান আকবর।

একই সময় আরেকটি ফোন

একই সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিলেন অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল।

হঠাৎ একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। নম্বরের সঙ্গে সেনাবাহিনীর প্রতীক দেখে তিনি বিস্মিত হন।

ফোনের অপর প্রান্ত থেকে তাকে সেনাসদরে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। জানানো হয়, সেনাপ্রধান তার সঙ্গে কথা বলতে চান।

হঠাৎ এমন ফোন পেয়ে তিনি প্রথমে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

তার নিজের ভাষায়, পরিবারের সদস্যরাও আশঙ্কা করেছিলেন, হয়তো তাকে গ্রেফতার কিংবা গুম করা হতে পারে।

পরিস্থিতি বুঝতে তিনি সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন জানতে পারেন, দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও ক্যান্টনমেন্টে যাচ্ছেন।

এতে তার আশঙ্কা অনেকটাই কেটে যায় এবং তিনিও সেনাসদরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

এরই মধ্যে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস নতুন এক মোড়ে প্রবেশ করতে শুরু করেছে।

(চলবে)

পরবর্তী পর্বে থাকবে: ক্যান্টনমেন্টের বৈঠকে কী আলোচনা হয়েছিলো, শেখ হাসিনার দেশত্যাগ, ছাত্রনেতাদের আপত্তি, আসিফ মাহমুদের ফেসবুক লাইভ এবং বঙ্গভবনের নাটকীয় বৈঠকের বিস্তারিত।

জনপ্রিয়

শীর্ষ সংবাদ:

বগুড়ায় বাসচাপায় ৬ শ্রমিক নিহত, আহত ১৫
সরকারবিহীন রাষ্ট্রের রুদ্ধশ্বাস চারদিন: ক্যান্টনমেন্ট থেকে বঙ্গভবন
বিএনপি এমপি বীথিকাকে আইনি নোটিশ দিলেন আসিফ মাহমুদ
রাজধানীর গণপরিবহনে প্রবেশ করছে মনোরেল
ছয় মাস পূর্তিতে সরকারে বড় রদবদলের ইঙ্গিত
বিশ্বকবিকে স্মরণে বাঙালির বিষাদঘন দিন ২২ শ্রাবণ আজ
ইয়েমেনে হুথি হামলায় সরকারি বাহিনীর ৩০ সদস্য নিহত
দেশের সব বিমানবন্দরে কড়া নিরাপত্তার নির্দেশ
এসএসসি ও সমমানের ফল প্রকাশ সোমবার
পাকিস্তান হাইকমিশনারের ঢাকার বাসভবনে আগুন, স্ত্রীসহ হাসপাতালে ভর্তি
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনার প্রত্যার্পণের দাবি এনসিপির
অচিরেই আওয়ামী লীগ বিএনপির সঙ্গে মিশে যাবে: বিএনপি এমপি নাছির
কাজী জেসিন বিটিভির নতুন মহাপরিচালক
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা
বিতর্ককে পেছনে ফেলে ‘লক আপ ২’-এর চ্যাম্পিয়ন শ্রেয়া কালরা
পতনের আগেই স্বজনদের নিরাপদে সরিয়ে নেন হাসিনা
জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উন্মুক্ত; অনলাইনে টিকিট কাটবেন যেভাবে
বাবরের নেতৃত্বে দাপুটে জয় পাকিস্তানের, সিরিজ শেষ সমতায়