১৯ দিন ধরে অনশনে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা
দিল্লির জামিয়া মিলিয়া যেনো পুলিশ ক্যাম্প
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির ঐতিহ্যবাহী জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয় এখন কার্যত পুলিশি নিয়ন্ত্রণে। ক্যাম্পাসের প্রবেশপথ বন্ধ, চারপাশে ব্যারিকেড, মোতায়েন রয়েছে বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে লাইব্রেরি, হোস্টেল, ক্যান্টিন ও শৌচাগারেও তালা দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই ছাত্র সংসদ নির্বাচনসহ বিভিন্ন দাবিতে ১২ অক্টোবর থেকে অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের একটি অংশ।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সাউথ ফার্স্ট অনলাইনের এক প্রতিবেদনে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ার বর্তমান পরিস্থিতির বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২৪ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। শতবর্ষেরও বেশি পুরোনো এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকা এখন কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনীতে রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ক্যাম্পাসে প্রবেশের প্রধান কয়েকটি ফটক ঝালাই করে বন্ধ করে দিয়েছে। লোহার পাত ও দেয়াল দিয়ে প্রবেশপথগুলো অবরুদ্ধ করা হয়েছে। মেট্রো স্টেশনসংলগ্ন এলাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে এক হাজার থেকে দুই হাজার পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী এবং ইন্দো-তিব্বত সীমান্ত পুলিশের (আইটিবিপি) সদস্য মোতায়েন রয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা তাদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। আবার ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদেরও বাইরে যেতে বাধা দেয়া হচ্ছে। আশপাশের সড়কগুলোতে বসানো হয়েছে ব্যারিকেড। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সম্পত্তি নষ্ট, শান্তিশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করা এবং একাডেমিক কার্যক্রমে বাধা দেয়ার অভিযোগ তুলে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এলাকায় ভারতের ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারার অধীনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে পুরো এলাকাটি পুলিশি নিরাপত্তাবেষ্টিত একটি অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
অনশন ভাঙাতে বলপ্রয়োগের অভিযোগ
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয় গত ১২ অক্টোবর। শনিবার পর্যন্ত এ কর্মসূচির ১৯ দিন পার হয়েছে। এর মধ্যে গত ১৭ অক্টোবর ভোরে অনশনরত শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দিতে অভিযান চালানোর অভিযোগ উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মী ও পুলিশের বিরুদ্ধে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওই দিন ভোরে ক্যাম্পাসের সংশ্লিষ্ট এলাকার সব আলো নিভিয়ে দেয়া হয়। এরপর অনশনরত শিক্ষার্থীদের টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে আনা হয় এবং মাটিতে ফেলে মারধর করা হয়। নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশালীন আচরণের অভিযোগও করেছেন তারা। এ ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষার্থীকে গ্রেফতার করা হয়।
শিক্ষার্থীদের আরও অভিযোগ, আলোচনার কথা বলে চাপ সৃষ্টি করে ভোরবেলা দুই শিক্ষার্থীর কাছ থেকে স্বাক্ষর নেয়া হয়। পরে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দাবি করে, শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন।
তবে আন্দোলনরত অন্য শিক্ষার্থীরা কর্তৃপক্ষের এ ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের দাবি, মানসিক চাপ ও হয়রানির মাধ্যমে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেয়া হয়েছে। ফলে আন্দোলন প্রত্যাহারের যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের প্রকৃত সিদ্ধান্তের প্রতিফলন নয়।
এ ঘটনায় কয়েকজন অনশন থেকে সরে এলেও এবিন বাসিল ও রেহান খানসহ আরও অনেকে কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। নতুন করেও কয়েকজন শিক্ষার্থী তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।
খাবার-পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধের অভিযোগ
ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের জীবনযাপনও কঠিন হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের ক্যাম্পাস ছাড়তে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। লাইব্রেরি, হোস্টেল ও শৌচাগারগুলোও তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। বন্ধ রয়েছে ক্যান্টিন ও খাবারের ব্যবস্থা।
বাইরে থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য খাবার ও পানি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও বাধা দেয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি অনশনরত শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার উদ্যোগেও বাধা দেয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন আন্দোলনকারীরা।
এ পরিস্থিতিতে বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা গভীর রাতেও ক্যাম্পাসের ভেতরে অবস্থান করে প্রতিবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়েই তারা এখন অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছেন।
ছাত্র সংসদ নির্বাচনই আন্দোলনের মূল দাবি
জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় বর্তমান আন্দোলনের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়ার ইতিহাস। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৫ সালে। ২০০৬ সালের মার্চে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ কমিটি ভেঙে দেয়া হয়।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের জানায়, তাদের কোনও অভিযোগ বা দাবি থাকলে তা বিভাগভিত্তিক বিষয় সমিতি অথবা শ্রেণি প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জানাতে হবে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা এ ব্যবস্থাকে যথেষ্ট মনে করছেন না।
তাদের প্রশ্ন, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়ায় কেনো নির্বাচন বন্ধ থাকবে?
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া ছাত্র সংসদ পুনরায় চালু করা এবং ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের নির্বাচনের সময়সূচি অবিলম্বে ঘোষণা করা। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ছাত্র সংসদের নতুন গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং তা চূড়ান্ত হওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ ছাড়া আন্দোলনে অংশ নেয়া শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে জারি করা সব সাময়িক ও চূড়ান্ত বহিষ্কারাদেশ এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ প্রত্যাহারের দাবি রয়েছে। হোস্টেলে সুপেয় পানির ব্যবস্থা ও শৌচাগারের উন্নয়ন, লাইব্রেরির সমস্যা সমাধান, ফি ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়নও তাদের দাবির অংশ।
শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সংকট
১৯২০ সালের ২৯ অক্টোবর ব্রিটিশ শাসনামলে উত্তর প্রদেশের আলীগড়ে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয়তাবাদী মুসলিম নেতারা। ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প হিসেবে স্বাধীন ও জাতীয়তাবাদী আদর্শ এবং আধুনিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিলো।
দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অধিকারী এ বিশ্ববিদ্যালয় একসময় স্বাধীনতা, জাতীয়তাবাদ ও শিক্ষার বিকল্প ধারার প্রতীক হিসেবে পরিচিতি পায়। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থীদের অধিকার ও ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে তাদের বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করেছে।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন সরকারের ভূমিকার কারণে ক্যাম্পাসে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না। তাদের ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়টি এখন কার্যত একটি আটককেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও শিক্ষার্থীদের অন্যান্য দাবি নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা, প্রশাসনিক স্বাধীনতা এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকারসংক্রান্ত বৃহত্তর সংকটে রূপ নিয়েছে। অনশন অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সবার দেশ/কেএম




























